পিঠমোড়া সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা



আকাশ চৌধুরী //

ছেলেটি নিখোঁজ বাবার সন্ধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধুদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। থানা-পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরছিল। তবুও কোন হদিস ছিল না। আর যখন সন্ধানের খবর এলো তখন কাছে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরার সুযোগও ছিল না। সন্তানের সামনেই পিছমোড়া অবস্থায় হাতকড়া পড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। চোখের সামনে বাবা-ছেলের এ দৃশ্য কত যে নির্মম তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

বলছিলাম সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম ওরফে কাজলের কথা। ৫৪ দিন নিখোঁজ থাকার পর যার হদিস মিলে যশোরের বেনাপোলে। সবচে দুঃখের বিষয় হলো এতদিন পর তিনি ফিরে এলেও পরিবারের কাছে না গিয়ে তার জায়গা হয়েছে কারাগারে। আর সেটা হয়েছে পুলিশের দায়ের করা ৫৪ ধারার একটি মামলায়। যদিও বিজিবি’র পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কাগজপত্র ছাড়া ‘অনুপ্রবেশ’এর দায়ে আরও একটি মামলা করা হয়। নিজ দেশের নাগরিক কেন অনুপ্রবেশ করবেন এটা অবশ্যই প্রশ্ন থেকে যায়। তবে পরবর্তীতে পুলিশের দায়ের করাসহ দুই মামলায় তাকে পিছমোড়া অবস্থায় হাতকড়া পরিয়ে আদালতে নেয়ার পর যশোরের জ্যেষ্ঠ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হলে বিজিবি’র মামলায় তার জামিন হলেও পুলিশের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।

সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম ওরফে কাজল গত ১০ মার্চ ঢাকার হাতিরপুলে নিজের অফিস থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ হন। ১৮ মার্চ পরিবারের পক্ষ থেকে চকবাজার থানায় একটি মামলাও করা হয়। একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, তিনি যেখান থেকে নিখোঁজ হন, সেখানে কয়েকজন তরুণ তার মোটরসাইকেল অনুসরণ করছিলেন। কিন্তু তাদের শনাক্ত করার কোন খবর পাওয়া যায়নি। সাধারণত কেউ নিখোঁজ হলে তাকে উদ্ধারের জন্য দেশের থানাগুলোতে বেতার বার্তা পাঠানো হয়ে থাকে। তার ক্ষেত্রেও হয়তো সেটা করা হয়েছে। এছাড়া নিখোঁজের খবরটিও গণমাধ্যমে এসেছে একাধিকবার। ফলে শফিকুল সম্পর্কে পুলিশ ওয়াকিবহাল থাকার কথা। ধরে নিলাম তিনি ভারত থেকে অবৈধভাবে দেশে ফিরেছেন সেজন্য বিজিবি মামলা করেছে। কিন্তু পাশাপাশি পুলিশের মামলা করাটি রহস্যজনক।

শফিকুল নিখোঁজ হওয়ার আগে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন আটক যুব মহিলালীগ নেত্রী পাপিয়াকে নিয়ে। সেই সূত্র ধরে মাগুরার সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর তাকেসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন শেরেবাংলা নগর থানায়। এছাড়া আরও দুই যুব মহিলা লীগ নেত্রী একই ধারায় মামলা করেন। যশোর আদালতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আটক শফিকুলের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা থাকায় তাকে ৫৪ ধারায় কারাগারে আটক রাখা প্রয়োজন। আর এ থেকেই পুলিশের আচরণে রহস্যের প্রশ্ন আসছে। কারণ কারও বিরুদ্ধে যদি মামলা থাকে তাহলে পুলিশ সরাসরি সেই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বেনাপোল পুলিশ তা করেনি। বরং একজন সাংবাদিককে পিছমোড়া অবস্থায় হাতকড়া পরিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। কিন্তু কেন, কার ইশারায় সেটা হলো সেটাই এখন প্রশ্ন।

শফিকুল ইসলাম ওরফে কাজল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই প্রভাবশালীদের বিষয়টি আলোচনায় আসছিল। আর পুলিশকেও তাকে উদ্ধারের ব্যাপারে তেমন কোন তৎপরতা দেখাতে লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ একজন নাগরিকের সন্ধান দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর যখন যেভাবেই হোক শফিকুলের সন্ধান মিললো তখন তার সঙ্গে করা হলো মধ্যযুগীয় আচরণ। প্রশ্ন আসে তিনি কোন দাগি অপরাধী কি-না। তার বিরুদ্ধে দেশের কোথাও ডাকাতি, চোরাচালান, হত্যা, ধর্ষণ বা গুমের মতো কোন ঘটনার মামলা আছে কি-না। আর যদি তা না-ই থাকে তাহলে পুলিশের অতিউৎসাহী হওয়ার পেছনে কারণ কি?

দেশের বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছে। মানুষ এ বাহিনীকে ‘বন্ধু’ হিসেবেই দেখছে। তবে মাঝেমধ্যে এ ধরণের ঘটনা সবকিছু ম্লান করে দেয়। যেমনটি হয়েছে নিখোঁজ এই সাংবাদিকের ক্ষেত্রে। একজন মানুষ ৫৪ দিন নিখোঁজ অবস্থায় থাকার পর তার মানসিক অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে পড়ে। আর সেখানে এই সাংবাদিকের ফিরে আসার পর তাকে পরিবারের হাতে তুলে না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো।

আমরা জানি আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় এই সমাজের নিকৃষ্ট কিছু মানুষের কারণে তা সমানভাবে প্রয়োগ হয় না। আইনের এই অপপ্রয়োগের কারণে জবাবদিহি করতে হয় রাষ্ট্রকেও। এই তো কিছুদিন আগেও কুড়িগ্রামের এক সাংবাদিককেও প্রশাসনের কর্মকর্তারা রাতের আঁধারে ধরে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে সাজা দিলেন। এরপর দেশব্যাপী এই ঘটনায় নিন্দার ঝড় ওঠায় তাদের শাস্তি হয়। কিন্তু সব সময় সব ঘটনা ঝড় হয়ে ওঠে না। কিছু থেকে যায় আড়ালে। ফলে সবার ক্ষেত্রে সঠিক বিচার পাওয়া হয় না। সাংবাদিক শফিকুল যদি কোন অন্যায় করে থাকেন তবে তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে। কিন্তু তা না করে পুলিশ তাকে ৫৪ ধারার মামলায় আদালতে সোপর্দ করল। তারা কি পারতেন না চকবাজার থানায় নিখোঁজের মামলায় উদ্ধার দেখিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিতে। বেনাপোল পুলিশের কাছে যদি শফিকুলের বিরুদ্ধে ঢাকার থানায় মামলা হওয়ার তথ্য থাকে, তাহলে তার নিখোঁজের তথ্যটিও তাদের কাছে রয়েছে। এবং কি কারণে তিনি নিখোঁজ ছিলেন তাও গণমাধ্যমের মাধ্যমে তারা জেনেছেন।

আমরা লক্ষ্য করেছি শফিকুলকে যখন আদালত চত্বরে গাড়ি থেকে নামানো হয় তখন তার চোখে মুখে ছিল আতঙ্কের ছাপ। ধারণা করা হচ্ছে তাকে কেউ অপহরণ করে নির্যাতনের পাশাপাশি নানা হুমকিও দিয়েছে। আর যদি সেটা হয়ে থাকে তবে কারা কেন দিতে পারে তা অনেকটা স্পষ্ট। কারণ বলা হচ্ছে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণেই তার নামে মামলা হয়েছে এবং এরপর থেকেই নিখোঁজ। তাহলে এর নেপথ্যে কে বা কারা ছিল তা সরকারের সংশ্লিষ্টদের নখদর্পণে থাকার কথা। রাষ্ট্রের বাহিনী যদি এমন আচরণ করে তাহলে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের আর স্বাধীনতা রইলো কোথায়? ফলে শফিকুলের ক্ষেত্রে কেন কার ইশারায় এ ধরনের আচরণ করা হলো সেটা বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রয়োজন কি-না সেটা রাষ্ট্রই ভালো জানা। সরকারের উচিত কারা শফিকুল ইসলামকে এতদিন গুম করে রেখেছিল, কোথায় রেখেছিল তা বের করে এদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা। কারণ এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে সংবাদপত্র বা সাংবাদিক সমাজ কতটুকু হুমকির মুখে।

[লেখক : সাংবাদিক]

শেয়ার করুন!