করোনা মোকাবিলায় যোগ্য সহযোদ্ধা কোথায়, প্রশাসন



শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন /

প্রতিনিয়ত আমরা খবর পাচ্ছি, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ও কানাডার মতো দেশ করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে যারা সবচেয়ে এগিয়ে, যাদের রয়েছে সবচেয়ে উন্নত মানের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বীমা ব্যবস্থা, তারাই যদি কোনো সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খায়, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। তবে এ পর্যন্ত বলে থেমে গেলে সেটি হবে বাস্তবতার খণ্ডিত চিত্রায়ণ। কেননা বিষয়টি উন্নত ও অনুন্নত এবং ধনী ও গরিব রাষ্ট্রের নয়, বিষয়টি হচ্ছে সতর্ক হওয়ার ও সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার।

আইসল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে যখন প্রতি মিলিয়নে ১০ হাজার থেকে লক্ষাধিক মানুষের কভিড-১৯ শনাক্তকরণ টেস্ট হচ্ছে, আমাদের দেশে তখন প্রতি মিলিয়নে হচ্ছে গড়ে ৯০ থেকে ২০০ জনের। উপরন্তু আমাদের এখানে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো প্রক্ষেপণ তৈরি হয়নি, ফলে প্রক্ষেপণের ভিত্তিতে নেওয়া হয়নি কোনো ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কভিড-১৯ মোকাবিলার সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত কর্মকৌশল। যা কিছু করা হচ্ছে, সেগুলো ‘অ্যাডহক’ বলেই প্রতীয়মান। এর সঙ্গে রয়েছে অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা।
স্বীকার করতেই হবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিনরাত চেষ্টা করছেন পরিস্থিতি সামাল দিতে। ফোনে তার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কথা হয়েছে যেন দুই বন্ধুপ্রতিম দেশ করোনা পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য খাদ্য সংকট সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করতে পারে। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লফভেন তাকে ফোন করে আশ্বস্ত করেছেন, সুইডেন বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি অব্যাহত রাখবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের ভেতরে ভিডিও কনফারেন্স করে ডিসি-এসপি, সিভিল সার্জন ও সংশ্নিষ্ট অন্যদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন। সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সক্রিয়তা ও কর্মতৎপরতা দেখে অনুপ্রাণিত হই। আশায় বুক বাঁধি, কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ হয়তো মোটামুটি ধরনের একটি স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছে যাবে। কিন্তু ছাপা কাগজ ও টেলিভিশনগুলোর সচিত্র প্রতিবেদনের মাধ্যমে যখন দেখি অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা, তখন আবার হতাশ হয়ে যাই। এটা ঠিক যে, কভিড-১৯ পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইতালি ও স্পেনের মতো দেশ হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু এটাও তো লক্ষণীয় যে, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, এমনকি বাংলাদেশের সমমানের কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ভুটান ও মালদ্বীপ সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে করোনা পরিস্থিতি ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে।
তাহলে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী কেন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও স্পেনের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো! আমাদের কী স্বভাব হয়ে গিয়েছে যে, কোনো ক্ষেত্রে যেসব রাষ্ট্রের অবস্থা খারাপ, তার সঙ্গে বাংলাদেশের তুলনা করে আত্মতুষ্টিতে ভোগা! স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার একদম ভেতরে কী হচ্ছে সেটি না হয় না-ই বললাম। যে ঘটনাগুলো তথ্যউপাত্ত দ্বারা প্রমাণিত, সেগুলো উল্লেখ করলেই তো ভয় লাগে।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে সরকার সুরক্ষা সামগ্রী কিনছে। সিএমএসডি জেএমআই গ্রুপকে এন-৯৫ মাস্ক, পিপিইসহ অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করতে বলে। এ নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে উঠেছে। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, তারা সুরক্ষা সামগ্রী পাননি। পরে যখন তাদের সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়, তখন তারা বলেন, তাদের সরবরাহ করা মাস্কটি ‘এন-৯৫ মাস্ক’ নয়। পিপিই বলে তাদের যে জিনিস দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। নকল ও নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় খুলনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. এটিএম মঞ্জুর মোর্শদকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে এবং মুগদা মডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাদেকুল ইসলামকে ওএসডি করা হয়েছে।
আমরা দেখছি, ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। রোববার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখলাম, কভিড আক্রান্ত স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছেছে। বাড়ছে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যের সংখ্যা। জনসাধারণের সংস্পর্শে যাওয়া আরেকটি পেশা সাংবাদিকরাও আক্রান্ত হচ্ছে। তিন পেশারই বেশ কয়েকজন প্রাণও হারিয়েছেন। হতে পারে, পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী থাকলে তাদের হারাতে হতো না। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে এত চিকিৎসক, পুলিশ ও সাংবাদিককে আক্রান্তও হতে হতো না। এর দায় নিম্নমানের বা নকল ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী আমদানিতে জড়িতরা এড়াতে পারেন না।
আরও আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক- এই তিনজনই রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে আওয়ামী লীগ-শিবিরের নন বলে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে। তাহলে এরা কী করে আওয়ামী লীগ সরকারের এত গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন হলেন? কভিড পরিস্থিতির কারণে এই পদগুলো এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সচিব না হয় প্রশাসনিক পদ, এবং দল-মত নির্বশেষে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন হওয়াতে আলোচিত ব্যক্তি স্বাস্থ্য সচিব পদে পদায়িত হয়েছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক শিকড় কেন আওয়ামী লীগের বাইরে থাকবে? অভিযোগ ওঠার পরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মেয়াদ বাড়ে কীভাবে?
কান পাতলে ঢাকার বাতাসে আক্ষেপ শোনা যায়- মূলগতভাবে আওয়ামী লীগ বিরোধীদের দাপটে প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকে কোণঠাসা। আওয়ামী লীগে বসন্তের কোকিলদের দৌরাত্ম্যে নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা দূরে সরে গেছেন বলে প্রায়ই আক্ষেপ শুনতে পাই। অনেকেই প্রামাণিক তথ্য-প্রমাণ দিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব আক্ষেপের কথা লিখছেন।
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, সবকিছুতে দল খোঁজেন কেন ভাই? প্রশাসনে তো দল-মত দেখলে চলে না। প্রশাসনিক নিয়মে যোগ্য ব্যক্তিদের যোগ্য পদে বসিয়ে প্রশাসন ও সরকার চালাতে হয়। প্রশাসনিক নিয়মে যোগ্যতার ভিত্তিতে যদি বাংলাদেশে সরকার, প্রশাসন পরিচালিত হতো; তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস- বাংলাদেশের সরকার ও প্রশাসন হতো অনেক বেশি দক্ষ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও পেশাদার। তখন নাগরিক সেবাও অনকে বেশি সন্তোষজনকভাবে নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু যাদের বসানো হয়, তারা যেমন অদক্ষ, তেমনই রাজনৈতিক অঙ্গীকারবিহীন। ফলে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, জনপ্রিয়তা, জনসেবার বিষয়গুলো তাদের মাথায় থাকে না। এর ফলে জনসাধারণ দুই দিক থেকে বঞ্চিত হয়।
উদাহরণ হিসেবে বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কথা বলি। করোনার ভয়াল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি কী করে ঢাকার দুটি মেয়র পদে নির্বাচন পরিচালনা করলেন? কী করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তিনি ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেন? করোনা পরিস্থিতিতে ঢাকার জনপ্রতিনিধিরা কী করছেন জানি না। মেয়ররা কী করছেন জানি না। ওদিকে করোনার মধ্যেই চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু।
আমার একটা সন্দেহের কথা বলি। করোনা পরিস্থিতি যে এতটা গুরুতর হবে এবং তা মোকাবিলায় সুদুরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে- এ ব্যাপারে সরকারকে কেউ ইচ্ছাকৃত অন্ধকারে রাখছে না তো? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে যখন সরকারের রাজনৈতিক আদর্শের বাইরের মানুষ থাকে, তখন এমন সন্দেহ কি অমূলক?
সাবেক মন্ত্রী, বর্তমান সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন তার এক সাম্প্রতিক কলামে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটির এক সভায় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নেওয়া ব্যবস্থাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য সচিব সভাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রটোকল অনুযায়ী সব প্রস্তুতি নেওয়া আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও একই কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা দেখলাম যে, করোনাযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, ও পুলিশেরই পিপিইসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সামগ্রী নেই। এই যখন পরিস্থিতি, তখন জনগণের স্বাস্থ্যসেবার কথা আর না-ই বা বললাম।
নিবন্ধটি যখন শেষ করতে যাব, তখন সমকালে প্রকাশিত একটি খবর দেখে আনন্দে মন ভরে গেল- কভিড মহামারির কালে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির ৬৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে নবম শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্ক বিশ্নেষণের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দি ইকোনমিস্ট। তালিকায় চীন, ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেমন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে হিসেবে বিশ্বের স্বীকৃতি পেয়েছে, তেমনি তার নেতৃত্বে করোনাযুদ্ধেও বাংলাদেশ জয়লাভ করবে বলে আমরা প্রবল আশাবাদী। কিন্তু তার জন্য শেখ হাসিনার চারপাশে চাই রাজনৈতিক আদর্শে ও প্রশাসনিক দক্ষতায় তার অনুসারী সহযোদ্ধাদের। চাই এমন মন্ত্রী বা সচিব, যারা করোনা মোকাবিলায় অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতা দূর করে এই লড়াইয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে পারবে।
অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন!