এরা কি দেশ জনগণ ও সরকারের শত্রু নয়



আকাশ চৌধুরী /

সুনামগঞ্জ জেলার একটি গ্রাম ছিল। এক বা দেড় যুগ আগে গণমাধ্যমে প্রায়ই খবর আসতো সেই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশাই নাকি ছিল চুরি। ফলে গ্রামটিও চোরের গ্রাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। যদিও কেউ ‘পেটের দায়ে’ চুরি করে আবার কেউ ইচ্ছে করেই ‘বড়লোক’ হওয়ার জন্য ডাকাতি করে। আবার এই চুরি ও ডাকাতির মধ্যেও তফাৎ রয়েছে। মানুষের বাড়িতে গিয়ে যারা চুরি করে তাদের বেশির ভাগই ‘পেটের দায়ে’ বলে ধরে নেয়া হয়। আর যারা ইচ্ছে করে লুটপাট বা ডাকাতি করে সেটা পেটের দায়ে হতে পারে না। অবশ্য সাধারণ চুরির তেমন একটা শাস্তি হয় না, যেটা ডাকাতির বেলায় হয়ে থাকে। তাও যদি থানায় এজাহার নথিভুক্ত হয় এবং সেটার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে সত্য প্রতিবেদন দাখিল করেন। কিন্তু যখন দায়সারা প্রতিবেদন দাখিল হয় তখন কোনো ডাকাত সঠিক বিচারের মুখোমুখি হয় না। ফলে মানুষের মধ্যে চাপা একটা ক্ষোভ থেকেই যায়।

প্রথমেই বলছিলাম একটি গ্রামের মানুষের চুরির কথা। আজ আর সেই গ্রামের মানুষ নিয়ে আলোচনা নেই। হয়তো তারা চুরির মতো লজ্জাজনক এ ‘পেশা’ ছেড়ে দিয়েছেন। যুগের পরিবর্তনে সভ্যতায় ফিরে এসেছেন। তারা হয়তো ক্ষুধার যন্ত্রণায় এ বাড়ি ও বাড়িতে গিয়ে চুরি করতেন। আজ তারা সমাজে মাথা উঁচু করে চলছেন এবং এটাই স্বাভাবিক; কারণ মানুষ পরিবর্তনশীল। যে কোনো সময় নিজেকে সামলে নিতে পারেন। কিন্তু কথায় আছে ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’। কয়লা যতোই ধূবেন শুধু কালো রং-ই দেখা যায়। উল্লিখিত গ্রামের মানুষের মতো অনেকেই হয়তো ‘পেটের দায়ে’ চুরি করতেন। তবে যারা এই সমাজে বা রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে বসে থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে চুরি, ডাকাতি ও প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তাদের ক’জন সম্পর্কেই বা আমরা জানি।

মাঝে-মধ্যে গ্রামে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মানুষ ‘চোর-ডাকাত’ বলে ডাকে। কিন্তু সবাইতো আর তা নয়। গুটি কয়েকের জন্য সকলের ঘাড়েই এর দায়ভার চাপে। অথচ এই চেয়ারম্যান-মেম্বাররাই সরকারি বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে জনগণের কাছে ছুটে যান। এর মধ্যে অনেকে অভ্যেসগত ভাবে কিছুটা অবৈধ সুযোগ-সুবিধার মতলবে থাকেন। শুধু তারাই নন, যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তার দলের কিছু নেতা-পাতি নেতাও এ মতলবের বাইরে নন। আর যদি কোনো দুর্যোগ আসে সেই সময়টায় বিভিন্ন মহলই অনৈতিক সুবিধা নেয়ার ফাঁদ পেতে থাকে। যেমনটি ধারা পড়েছে জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানফ্যাকচারিংয়ের ক্ষেত্রে।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে গোটা পৃথিবী স্তব্ধ। রোগটির কোনো ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হওয়ায় বিজ্ঞানীদের ঘুম হারাম। ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ বন্ধ থাকায় বিরাজ করছে চরম অর্থনৈতিক স্থবিরতা। বিশ্বের ধনী দেশগুলোও হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। এ থেকে বাইরে নয় আমাদের বাংলাদেশও। তবে করোনা ভাইরাস ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় মানুষকে বাঁচাতে সরকার নানাভাবে উৎসাহিত করছে। জারি করা হয়েছে দীর্ঘদিনের সরকারি ছুটি। বার বার বলা হচ্ছে ঘরে থাকার জন্য এবং একান্তই জরুরি প্রয়োজনে বাইরে যেতে হলে মুখে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়। একইভাবে যারা হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসা সেবায় জাড়িত তাদেরও মাস্কসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক নিরাপত্তামুলক জিনিস ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। ফলে তা সরবরাহ করতেও বিভিন্ন কোম্পানীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে উন্নয়নশীল একটি দেশ। দ্রুত গতিতে উন্নয়নমুলক কর্মকা- এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। ফলে সরকার দেশের মানুষের কথা ভেবে সকল পর্যায়ে ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তা সিটি করপোরেশন ও উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই দুর্যোগেও অসহায় মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে কিছু জনপ্রতিনিধি ও নেতা সরকারের ত্রাণ চুরি করে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে কয়েক চেয়ারম্যান-মেম্বার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং এদের বরখাস্তও করা হয়েছে। ফলে অনেকে যে তাদের ‘চোর-ডাকাত’ বলে আখ্যায়িত করতেন তা মিথ্যে নয়।

এদিকে সরকার থেকে যেসব কোম্পানী বিভিন্ন জিনিস উৎপাদনের দায়িত্ব পেয়েছে তাদের মধ্যেও চুরি বা প্রতারণা থেমে নেই। সম্প্রতি এমনই খবর বেরিয়েছে গণমাধ্যমে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পিপিই নীতিমালা অনুযায়ী, রোগীর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এন-৯৫ মাস্ক পরা জরুরি। কিন্তু মার্চের শেষ ভাগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব মাস্ক পাঠানো হয়, তার প্যাকেটে ‘এন-৯৫’ লেখা থাকলেও ভেতরে ছিল সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক। গত মার্চে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবহারের জন্য এসব মাস্ক কেন্দ্রীয় ঔষধাগারকে (সিএমএসডি) সরবরাহ করেছিল জেএমআই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর সিএমএসডি’র পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহিদ উল্লাহ ২ এপ্রিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে স্বীকার করেন, ‘ওই মাস্ক সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক ছিল। প্যাকেটের গায়ে এন-৯৫ লেখা হয়েছিল ‘ভুল করে’ (বিডিনিউজ২৪.কম)। তবে এখন এসব মাস্ক ফেরত নিয়ে এ দায় থেকে মুক্তি চাইছে কোম্পানিটি। সম্প্রতি সিএমএসডি’র এক চিঠির জবাবে কোম্পানিটি জানায়, ‘যে সময় মাস্কগুলো সরবরাহ করা হয়, তখনও দেশে এন-৯৫ এর স্পেসিফিকেশন সংক্রান্ত কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন ছিল না। পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জেএমআই হসপিটাল রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে বেশকিছু পণ্য সরবরাহ করে। সরবরাহকৃত পণ্যের সঙ্গে ভুলক্রমে প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট পর্যায়ে তৈরিকৃত ২০ হাজার ৬০০ পিস এন-৯৫ মাস্ক অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা এন-৯৫ এর স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে ‘কমপ্লাই’ করে না।’ চিঠিতে বলা হয়, ‘এ অবস্থায় ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও উপরোক্ত ব্যাখ্যা সদয় বিবেচনাপূর্বক সরবরাহকৃত মাস্ক ফেরত দিয়ে আমাদের অনিচ্ছাকৃত সম্পাদিত ভুলের দায় হতে মুক্তি দানে বাধিত করবেন।’ এছাড়াও কোম্পানিটি ১৯ এপ্রিল বিভিন্ন দৈনিকে বিজ্ঞাপন আকারে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এই বিজ্ঞপ্তির প্রথম দিকে নিজেদের সাফাই গেয়ে শেষ পর্যায়ে বলা হয়েছে, ‘জরুরি সরবরাহর সময় মাস্কগুলো ভুলবশত প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের জন্য সংরক্ষিত এন-৯৫ কার্টুনে সরবরাহ করা হয়।’ কোম্পানিটির বক্তব্যেই তাদের প্রতারণার বিষয়টি ধরা পেড়। কারণ কার্টনে ভুলবশত সরবরাহ করাটি স্বাভাবিক। তবে গণমাধ্যমে মাস্কের যে ছবি প্রকাশ হয়েছে তাতে দেখা গেছে এর মোড়কেও এন-৯৫ লিখা ছিল। এতে ধরে নেয়া যায় জেনে শুনেই সাধারণ মাস্ক সরবরাহ করে জেএমআই সরকার থেকে এন-৯৫ মাস্কের টাকা আদায় করতে চেয়েছিল।

আমরা সমাজে এতই নিষ্ঠুর যে নিজেদের আখের গোছানোর জন্য মানুষের জীবন নিয়েও চিনিমিনি খেলি। বর্তমানে যে মহামারী চলছে এতে সরকার যেখানে জনগণের জন্য সব উজাড় করে দিচ্ছে সেখানে কিছু ব্যক্তি বা কোম্পানির জন্য তা বিলিন করে দেয়া যায় না। যারা মানুষের খাদ্য চুরি বা সুচিকিৎসাতেও ব্যঘাত ঘটায় গুটিকয়েকের স্বার্থে এদের কখনো ক্ষমা করা যায় না। এদের বিষয়ে আরও কঠোর হওয়া দরকার। কারণ এরা আসলেও দেশের শত্রু, দেশের জনগণের শত্রু ও সরকারের শত্রু।

[লেখক : সাংবাদিক]

শেয়ার করুন!