আজীবন সৃজনের মোহে নিমগ্ন শামসুর রাহমান



সিএনবাংলাদেশ অনলাইন :

বাংলা ভাষায় কবিতার বরপুত্র শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়/ আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন তার কবিতায় উঠে এসেছে এ দেশের ভাষা, স্বাধীনতা, ঠিক একইভাবে এসেছে প্রেম, বিরহ, মানবতা ও মানুষ। ছন্দময় ও শিল্পিত শব্দের প্রক্ষেপণে কবিতার চরণে চরণে তিনি বলেছেন দেশ, মাটি ও মানুষের কথা। নাগরিক এই কবি আমৃত্যু স্বদেশ ও শেকড়ের প্রতি ছিলেন দায়বদ্ধ। আজ শুক্রবার বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান এই কবির ৯২তম জন্মদিন। ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলিতে জন্মগ্রহণ করেন এই বরেণ্য কবি। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

জন্মদিনে আজ শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করা হবে কবি শামসুর রাহমানকে। বরেণ্য এই কবির জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবিতা পরিষদ এবং শামসুর রাহমান স্মৃতি পরিষদ যৌথভাবে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে এক আলোচনা, নিবেদিত কবিতাপাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে ৭৭ বছরের বর্ণময় জীবনের বড় অংশজুড়েই তিনি নিমগ্ন থেকেছেন সৃজনের মোহ ও অনুরাগে। জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতাকে আধুনিকতার পথে ধাবিত করায় তার ভূমিকাটি একেবারেই স্বতন্ত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর তার দুটি বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবির নাম খোদাই করেছে অমরত্বের পাথরফলকে।

‘উনিশ শ’ ঊনপঞ্চাশ’ শিরোনামের একটি কবিতা দিয়ে ১৯৪৮ সালে নিজের পদচিহ্ন আঁকেন তিনি কবিতার আঙিনায়। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে মর্নিং নিউজে সাংবাদিকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশ ঘটে তার। ১৯৫৭ থেকে ১৯৫৯ সাল রেডিও পাকিস্তানের অনুষ্ঠান প্রযোজক ছিলেন। ১৯৬৪ সালে নভেম্বর থেকে দৈনিক পাকিস্তানের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন ’৭৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। এরপর তিনি দৈনিক বাংলা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে সামরিক সরকারের শাসনামলে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়।

১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। এছাড়াও ষাটের দশকে প্রকাশিত কবির উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ ও আমি অনাহারী। তার কলম থেকে ঝলসে উঠেছে বন্দিশিবির থেকে, দুঃসময়ে মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ-এর মতো স্পর্ধিত কাব্যগ্রন্থ। সত্তরের নভেম্বরের ভয়াল জলোচ্ছ্বাসের পর মওলানা ভাসানীর পল্টনের ঐতিহাসিক জনসভার পটভূমিতে রচিত ‘সফেদ পাঞ্জাবি’ অথবা তারও আগে ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, একাত্তরের পটভূমিতে তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা, স্বাধীনতা তুমি, গেরিলা, কাক কবিতাগুলোয় উচ্চারিত হয়েছে স্বদেশের কোটি মানুষের কণ্ঠধ্বনি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে জীবন বিসর্জন দেয়া আসাদকে নিয়ে লিখেছেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি।

যুদ্ধাপরাধীদের উত্থানে ক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়ে লিখেছেন ‘একটি মোনাজাতের খসড়া’, ‘ফুঁসে ওঠা ফতোয়া’র মতো আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবিতা। গণতন্ত্রের জন্য লড়াকু সৈনিক শহীদ নূর হোসেনকে উৎসর্গ করে রচনা করেছেন ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’। শামসুর রাহমান রচিত কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৬৬। উপন্যাস লিখেছেন ৪টি। লিখেছেন প্রবন্ধ ও ছড়ার বই। অনুবাদ বইয়ের সংখ্যা ৬টি। কর্মময় জীবনে স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, জীবনানন্দ পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন কবি শামসুর রাহমান। তাকে সম্মানসূচক ডিলিট উপাধি দেয়া হয় রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

শেয়ার করুন!