আত্মদানের গর্বে গর্বিত বাঙালি আজ



প্রতীকী ছবি।
বিশেষ প্রতিনিধি :

‘কালো রাজপথ যেন মনে হয়/হাজার হাজার পলাশ হয়ে চেয়ে রয়/সে কোন জাদুকর পথের উপর ফুটিয়েছে রক্ত পলাশ/ বুকের রুধিরে পাষাণ ঘিরে রেখে গেছে ইতিহাস/রেখে গেছে দুঃখিনী মায়ের পরিচয়/মায়ের দু’চোখে সে কোন পলকে বয়ে গেছে অশ্রু নদী/সে নদী এসে মিলেছে শেষে রক্ত পলাশ অবধি/রেখে গেছে হারানো প্রাণের বিনিময়।’ গীতিকার মো. রফিকুজ্জামানের লেখা ও সুজেয় শ্যামের সুরে এই গানের প্রতিটি ছত্রে বাঙালির বুকের গভীরে অনুরণিত হয় বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির সেই ‘ভাই হারানোর জ্বালা’। তীব্র বেদনা ও আত্মত্যাগের অহংকারের সঙ্গে ভাষার গৌরব সুপ্রতিষ্ঠিত করার অনন্য এক দিন আজ।

রক্ত-পলাশের ফাগুনের এমনই এক আগুনঝরা দিনে মায়ের ভাষায় কথা বলার দাবিতে রাজপথ রাঙানোর দিন; রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস, অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ; আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। জাতির জীবনে শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল, অহংকারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর দিন। সব পথ এসে আজ মিলে যাবে জাতির এক অভিন্ন গন্তব্যে, ভালোবাসার শহীদ মিনারে। হাতে হাতে বসন্তের সদ্য ফোটা ফুলের স্তবক, কণ্ঠে নিয়ে চির অম্লান সেই গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি…।’

ভাষার জন্য আত্মদানের গর্বে গর্বিত বাঙালি আজ রোববার পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে সেই সব উত্তরসূরিকে, যাদের বুকের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে কেবল বাঙলা ভাষায়ই নয়, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সব জাতির নিজস্ব ভাষার অধিকার। ভাষাসংগ্রামের ইতিহাসে তাই রক্ত-পলাশের মতো ফুটে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ বাংলাদেশ শুধু নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বর্ণময় কর্মসূচিতে স্মরণ করা হবে দিবসটি। বাঙালি, অবাঙালি সব মানুষ আজ এক হয়ে গাইবে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারীদের উদ্দেশে গান, শ্রদ্ধায় নিবেদন করবে পুষ্পের অর্ঘ্য। বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে ছোট-বড় সব শহীদ মিনারে নামবে মানুষের ঢল। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পালিত হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে রাষ্ট্রপতি বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক ভাষাই এখন বিপন্ন। একটা ভাষার বিলুপ্তি মানে একটা সংস্কৃৃতির বিলোপ, জাতিসত্তার বিলোপ, সভ্যতার অপমৃত্যু। তাই মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃৃতির বিকাশসহ সকল জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃৃতি রক্ষায় বিশ্ববাসীকে সোচ্চার হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২- বাঙালির গৌরবময় ঐতিহাসিক দলিলে ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো আমাদের জাতীয় জীবনে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছে। জনসাধারণের স্বার্থ সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস।

মাতৃভাষা আন্দোলনের ৬৯ বছর পূর্ণ হবে আজ। দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সড়কদ্বীপ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বর্ণমালাসংবলিত ফেস্টুন দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। আজিমপুর কবরস্থান থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত রাস্তায় অতিরিক্ত জনসমাগম ও ভিড় নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদান করছে। বিভিন্ন সংগঠন সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান, সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করছে।

সোনালি সেই ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরালে দেখা যায়, ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১১ মার্চ, ১৯৪৮ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট ডাকে। এদিন সচিবালয়ের সামনে থেকে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক ছাত্রনেতা গ্রেপ্তার হন। ১৫ মার্চ তারা মুক্তি পান। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। এরপর আরও কয়েকবার গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিব। দুর্বার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শাসকগোষ্ঠীর জারি করা ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে প্রাণ দেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি সেই রক্তস্নাত গৌরবের সুর বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আজ বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মানুষের প্রাণে অনুরণিত হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর এই দিনকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো। আজ সারাবিশ্বের সব নাগরিকের সত্য ও ন্যায়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেরণার উৎস ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’

নানা আয়োজন, কর্মসূচি: বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির কারণে এবার দিবসটি পালন উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং আজিমপুর কবরস্থানে সর্বস্তরের জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বরাবরের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই পালন করছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কভিড-১৯ উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২১’ সুষ্ঠুভাবে উদযাপনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসা সবাইকে বাধ্যতামূলক মাস্ক পরিধান করতে হবে। এ ছাড়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে প্রতিটি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচজন প্রতিনিধি ও ব্যক্তিপর্যায়ে একসঙ্গে সর্বোচ্চ দু’জন শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে পারবেন। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে এ বছর কোনো জনসমাগম ও অভ্যর্থনার ব্যবস্থা থাকবে না।

রাষ্ট্রীয় আয়োজনে একুশের অনুষ্ঠানমালার সূচনা হয় গত রাত ১২টা ১ মিনিটে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন একুশের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে। রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এসএম সালাহউদ্দিন ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, ভাষাসংগ্রামী, কূটনীতিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। আজ দুপুর আড়াইটায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানমালার ভার্চুয়াল উদ্বোধন করবেন প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০২১’ প্রদান করা হবে। অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, ইউনেস্কোর ঢাকা অফিসের হেড অব রিপ্রেজেন্টেটিভ বিয়েট্রিস কালডুন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন বক্তব্য দেবেন। এ অনুষ্ঠানে ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

সরকারি দল আওয়ামী লীগ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি পালন উপলক্ষে একাধিক কর্মসূচি নিয়েছে। আজ ভোর সাড়ে ৬টায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারাদেশে সংগঠনের সব শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সকাল ৭টায় কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। দলের কেন্দ্রীয় ও জাতীয় নেতারা এতে অংশ নেবেন। আগামীকাল সোমবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিকেল ৪টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে এ আলোচনায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য দেবেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আজ রোববার ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করবে। সকাল ৬টায় কালো ব্যাজ সহকারে বলাকা সিনেমা হলের সামনে দলীয় নেতাকর্মীদের জমায়েত এবং আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে যাত্রা ও শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে তারা। দুপুর ৩টায় ভার্চুয়াল আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। বিএনপির সিনিয়র নেতারাসহ দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও ভাষাসৈনিকরা এ আলোচনায় অংশ নেবেন। সারাদেশে দলের জেলা/মহানগর/উপজেলা/থানা ও বিভিন্ন ইউনিট কার্যালয়ে সকাল ৬টায় জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন এবং স্থানীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রধান ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা ও কালো পতাকা উত্তোলন করবে। আজ সকাল সাড়ে ৬টায় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশ থেকে সীমিত পরিসরে একটি প্রভাতফেরি বের করা হবে। উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান প্রভাতফেরিতে নেতৃত্ব দেবেন। প্রভাতফেরি সহকারে তারা আজিমপুর কবরস্থান হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যাবেন এবং পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

দেশের সব জেলা-উপজেলা সদরে দিবসটি পালনের লক্ষ্যে জাতীয় কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে স্থানীয় প্রশাসন নিজ নিজ কর্মসূচি পালন করবে। বিদেশে অবস্থিত মিশনগুলোয় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযথভাবে উদযাপিত হচ্ছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি পালন করবে।

শেয়ার করুন!