দালালদের খপ্পরে কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিস



মোঃ ফাইজুল হক গোলাপ, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি :

কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দালালদের কাছে পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা অসহায় হয়ে পড়েছে। এই অফিসে ১৫ ইং সেপ্টেম্বর শুরু হয় ই-পাসপোর্ট এর কার্যক্রম। তারপর থেকেই বেড়ে যায় দালারদের দৌরাত্ব। পাসপোর্ট করার জন্য অফিসে পরামর্শ করতে আসলে বলা হয় অনলাইনে আবেদন করতে হবে। তাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় স্থানীয় দালালদের কাছে। অফিসটি এখন দালাল চক্রের হাতে জিম্মি। পিয়ন থেকে শুরু করে আনসার পর্যন্ত সবাইকে নানা অজুহাতে দিতে হয় টাকা, না দিলে অন্তহীন ভোগান্তী। শুধু তাই নয় শারিরীক লাঞ্চনাসহ ভয়ভীতি দেখানো হয় পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের। তাই বাধ্য হয়ে পাসপোর্ট প্রত্যাশীদের যেতে হয় দালালদের কাছে। অফিসে সি.সি ক্যামেরা থাকাস্বত্বেও প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন চিহ্নিত দালাল ভিতের প্রবেশ করে আনসার ও অফিস স্টাফদের নিকট পাসপোর্ট এর আবেদন ফাইল জমা দিয়ে আসে। সরজমিনে কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এখন দালালদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১০০টির বেশী আবেদন জমা হয়। অনলাইন আবেদন করে ফরম নিয়ে ১০৭ নম্বর কক্ষে আবেদনকারীরা নিজেই জমা দিয়ে লাইনে দাড়িয়ে থাকেন। এই কক্ষের দায়িত্বরত সহকারী হিসাবরক্ষক আনিছুর রহমান সব ঠিক থাকার পরও নানা ছুতোয় ফের দিয়ে দেন আবেদন ফাইল। এখানে পাসপোর্ট করতে গিয়ে রীতিমতো ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সবাইকে। আবার পুলিশি যাচাই বাছাইয়ের নাম করে নেওয়া হয় আলাদা টাকা। তারপরেও পুলিশ রির্পোট পাঠাতে সময় লাগে ৫ থেকে ৭ দিন। অনেকেই জরুরী আবেদন করেও পাসপোর্ট পেতে সময় লাগে মাসের পর মাস। ফলে অনেকের শেষ হয়ে যাচ্ছে ভিসার মেয়াদ।

ভোক্তভোগীরা বলেন কারও কাছে অভিযোগ করেও সমাধান পাওয়া যায় না। সবাই যেন ম্যানেজড। এভাবেই চলছে পাসপোর্ট অফিসটি। সরজমিনে গিয়ে জানা যয় আনসার ও অফিস স্টাফ এর মাধ্যমে এডির চ্যানেল ফির নামে প্রত্যেক আবেদন ফাইল এর জন্য ১ হজার ১০০ টাকা করে দিতে হয় জানান স্থানীয় দালাল ও ভ‚ক্তভোগীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কমর্রত আনসারকে চ্যানেল ফির ১ হাজার ১০০ টাকার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন দালালরা সরাসরি অফিসে এসে আমাদের নিকট অথবা অফিস স্টাফ পাসপোর্ট ডেলিভারী রুমের হেলাল ডকস্ক্যান রুমের দায়িত্বে সেলিম ও অফিস পিয়ন আজিজ এদেরকে ১ হাজার ১০০ টাকা আবেদন ফাইল দিয়ে যায়। প্রত্যেকেই এক এক চ্যানেল এর সাংকেতিক চিহ্ন দেওয়া হয়। কার কি চিহ্ন দেওয়া হয় কোন স্টাফ কে বলা যাবে না। ১০৭ নম্বর কক্ষে আবেদন ফাইল জমা নেন সহকারী হিসাবরক্ষক আনিছুর রহমান উনিই যানেন কার কি চিহ্ন। সেই চিহ্ন দেখে আবেদন ফাইল স্বাক্ষর করেন। তিনি আরও বলেন বিকেল ৪টার পর হিসাব নিয়ে বসা হয় কার মাধ্যমে চ্যানেল ফির কয়টি আবেদন ফাইল দেওয়া হয়েছে সেই প্রত্যেক ফাইল প্রতি ১০০ টাকা করে আমাদেরকে দেওয়া হয়। বাকি সমস্ত টাকা হিসাব করে পিয়ন আজিজ অথবা সেলিম টাকা বুঝে নেন। সেই টাকা বুঝে নিয়ে সহকারী হিসাবরক্ষক আনিছুর রহমানকে দেওয়া হয়। সর্বশেষ টাকা এডির নিকট বুঝিয়ে দেন।

অনুসন্ধানে জানা যায় ৯ই নভেম্বর কটিয়াদী উপজেলার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন আনসার ইমরান এর মাধ্যমে এগার হাজার টাকা কন্ট্রাক করে ৫ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংক চালান জমা দিয়ে অন লাইনে পাসপোর্ট আবেদন জমা দেন। যাহার ডেলিভারী স্লীপ নম্বর ৪৯৯। ১৭ নভেম্বর করিমগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম দশ হাজার কন্ট্রাক করে ৪ হাজার ২৫ টাকা ব্যাংক চালান জমা দিয়ে পাসপোর্ট আবেদন জমা দেন। যাহার ডেলিভারী স্লীপ নম্বর- ৭৮৬। বাজিতপুর উপজেলার বাসিন্দা মাজাহারুল ইসলাম এগার হাজার টাকা কন্ট্রাক করে ৫ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংক চালান জমা দিয়ে পাসপোর্ট আবেদন জমা দেন। যাহার ডেলিভারী স্লীপ নম্বর- ১৪৯০, ভৈরবের নাঈম ও আমিন মিয়া সহ আরও অনেকেই নির্দিষ্ট সময় শেষ হওয়ার পর ডেলিভারী স্লীপ নিয়ে এসে দেখেন তাদের পাসপোর্ট বই আসেনি। এ নিয়ে প্রত্যেকেই কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করতে গেরে পাল্টা হুমকি ধামকি দিয়ে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়। মাসের পর মাস পড়ে থাকা পাসপোর্ট আবেদন কমীরা জানতেও পারেন না কি কারণে তার পাসপোর্ট হয়নি। আর এই ধরণের পাসপোর্ট প্রত্যাশিরা অফিসে গিয়ে হন লাঞ্চনার শিকার।

গত বুধবার কাটিয়াদী উপজেলার পাসপোর্ট আবেদনকারী জসিম উদ্দিন সংবাদকর্মীদের কে বিষয়টি জানানো পরদিন বৃহস্পতিবার কয়েকজন ভূক্তভোগীর পাসপোর্ট ডেলিভারী স্লীপ নিয়ে প্রধান কর্মকর্তার সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তিনি নিজেই কম্পিউটার দেখে বলেন অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ঠিকানা ভুল করে অনলাইনে আবেদন করেছেন, তাই তাদের পাসপোর্ট হয়নি। তাদের প্রত্যেকেই আবার নতুন করে আবেদন করতে হবে। এছাড়া আমার কিছুই করা নেই। ভূক্তভোগীরা তাদের প্রয়োজনে নতুন করে দিগুণ টাকা খরচ করে দালাল এর মাধ্যমে পাসপোর্ট আবেদন করেছেন। পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন ১৫টি কম্পিউটার এর দোকান রয়েছে। তাদের সাথে পাসপোর্ট আবেদন এর বিষয়ে কথা বললে তারা বলেন আমরা দোকান ভাড়া নিয়েছি। দোকানের প্রতি মাসে অনেক খরচ। আমাদের ই-পাসপোর্ট জন্য অনলাইনে সঠিকভাবে ফরম আবেদন করে দেই। ফরম বাবদ ১০০ থেকে ২০০ টাকা নিই। এতেই আমাদের দোকানের ব্যবসা ভালভাবে চলে যায়। আমাদের যখন আবেদনকারীরা বলেন পাসপোর্ট করে দিতে হবে তখন আমরা বলে থাকি ব্যাংক চালান বাদ দিয়ে অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হবে চ্যানেল ফির জন্য। জানা যায় যে, এই অনিয়ম এর অভিযোগ পাসপোর্ট অফিসের প্রধান কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুর রহমান এর বিরুদ্ধে। তিনি কিশোরগঞ্জে অফিসে যোগদান করার পর থেকে অফিস স্টাফ এর মাধ্যমে ১ হাজার ১০০ টাকা প্রত্যেক ফাইল জন্য চ্যানেল ফি ঠিক করে দেন। চ্যানেল ফাইল দিলে ভুলত্রুটি থাকলেও সঠিক সময়ে মধ্যে পাসপোর্ট বই পাওয়া যায়। সর্বশেষ চ্যানেল এর মাধ্যমে না গেলে ১টি আবেদন ফাইল স্বাক্ষর হয় না। ফলে পাসপোর্ট প্রত্যাশিরা বাধ্য হন দালাল এর মাধ্যমে চ্যানেল ধরতে। এসব অভিযোগ নিয়ে অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন চ্যানেল ফি ১ হাজার ১০০ টাকার বিষয়ে তার জানা নাই। এটা সরকারি নম্বর। আপনি সরাসরি অফিসে এসে ভিডিও রেকর্ড করে নিয়ে যান।

শেয়ার করুন!