ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির কাছে বিশ্ব



সিএনবাংলাদেশ ডেস্ক/
নোয়াম চমস্কি

বিশ্ববিখ্যাত লেখক, ভাষাবিদ ও দার্শনিক নোয়াম চমস্কি বলেছেন, আমরা যদি আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন সংকটের সমাধানে সুযোগগুলোকে কাজে না লাগাই, তাহলে শেষ পর্যন্ত পরমাণু যুদ্ধে জড়াতে পারে বিশ্ব। এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, পৃথিবী এখন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সেই বিপজ্জনক পরিণতির কাছাকাছি যাচ্ছে। সম্প্রতি জলবায়ু সংকট ও পরমাণু যুদ্ধের হুমকি নিয়ে ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য স্টেটসম্যানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন তিনি। ৯৩ বছর বয়সী মার্কিন এ অধ্যাপক বলেন, ‘পরিবেশ বিপর্যয় থেকে পৃথিবীতে এখন সংগঠিত মানবজীবন ধ্বংসের শঙ্কার মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। দূর ভবিষ্যতে নয়, আমরা এখন বাঁকবদলকারী লক্ষ্যের দিকে যাচ্ছি, যা আর এড়ানো সম্ভব নয়। এর মানে এই নয় যে, সবাই এখন মরতে বসেছে। এর অর্থ, এমন আগামী আসছে সেখানে যারা দ্রুত মারা যাবে, তারাই কেবল ভাগ্যবান।’

আগে যুদ্ধ, পারমাণবিক হুমকি, সমাজ, দর্শন নিয়ে প্রায় আলোচনা করতেন নোয়াম চমস্কি। ১৯৮৪ সাল থেকে ‘৯৬ পর্যন্ত সময়ে তার ও সাংবাদিক ডেভিড বার্সামিয়ানের আলোচনা ‘ভিন্নমতের উপখ্যান’ নামে প্রকাশিত হতো। তবে এবার বললেন অন্যান্য প্রসঙ্গের পাশাপাশি ইউক্রেন নিয়ে। বিষয়টি ব্যতিক্রমও। আজকের এ ইউক্রেনে তার বাবার জন্ম, তার মায়ের জন্মস্থল বেলারুশ। ১৯১৩ সালে জারের সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়াতে ইউক্রেন ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এ বুদ্ধিজীবীর বাবা। সেখানে এখন হামলা চালাচ্ছে রুশ বাহিনী। অনেক ইহুদির মতো চমস্কিরও পারিবারিক যোগসূত্র ওই মাটিতে। এ আক্রমণ প্রসঙ্গে নোয়াম চমস্কি বলেন, ‘এটি ইউক্রেনের জন্য মারাত্মক।’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের ‘অপরাধমূলক আগ্রাসনের’ নিন্দা জানান তিনি।

তবে কেন পুতিন এ হামলা চালালেন, তার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন। নোয়াম চমস্কির মতে, এ প্রশ্নের দুটি উত্তর হতে পারে। এক. এ বিষয়ে পশ্চিমাদের মনের মধ্যে কী আছে, কী তারা ঘটাতে যাচ্ছে, সেগুলো জানার চেষ্টা করা। দুই. হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ কী হবে, তা জানা। এ বিষয়ে তাদের কৌশলগত জোরালো বক্তব্য জানিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য আধুনিক সামরিক অস্ত্র পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া কিয়েভকে ন্যাটোর কৌশলগত কর্মসূচিতেও যুক্ত করার দিকে এগোচ্ছে তারা। যেহেতু আপনি জানেন না, কোনটা ঠিক- তাই আপনি পছন্দ করে বাছাই করতেই পারেন। তিনি বলেন, এখন যদি সেখানে সমঝোতা না হয়, তাহলে বিশ্ব পরমাণু যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে।

পুতিনের প্রধান আশঙ্কা কি ন্যাটোর সম্প্রসারণ নাকি ইউক্রেনে উদারনৈতিক গণতন্ত্র? এ বিষয়ে নোয়াম চমস্কি বলেন, আমাদের মতো পুতিনও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন। কয়েক মিনিটের জন্য যদি প্রপাগান্ডা ছেড়ে বেরিয়ে আসা যায়, তাহলে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র ধ্বংস ও অবদমনের রেকর্ড দেখতে পাব। যেমন ১৯৫৩ সালে ইরানে, ১৯৫৪ সালে গুয়েতেমালায়, ১৯৭৩ সালে চিলিতে…। কিন্তু এখন সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক প্রতিশ্রুতিকে অবশ্যই সম্মান ও প্রশংসা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘ন্যাটোর সম্প্রসারণ কী? যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার তৎকালীন সোভিয়েত নেতা গর্বাচেভকে দ্ব্যর্থহীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দুই জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করে ন্যাটো জোটে যোগ দিতে সম্মত হলে, এ জোট পূর্ব ইউরোপে এক ইঞ্চিও এগোবে না। এ দারুণ চুক্তি নিয়ে এখন মিথ্যাচার চলছে।’
১৯৯০ সালে এসব বিষয়ে পর্যবেক্ষণ ছিল নোয়াম চমস্কির। তার ভাষ্য, নুরেমবার্গ আইন প্রয়োগ করা হলে যুদ্ধপরবর্তী সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে ফাঁসিতে ঝুলতে হতো। এদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সম্পর্কে বিষণ্ণভাবে কথা বলেছেন তিনি।

তিনি বাইডেনের সাম্প্রতিক বক্তব্য উল্লেখ করেছেন। ইউক্রেনে হামলা নিয়ে বাইডেন বলেছিলেন, এ আগ্রাসনের পর পুতিন আর প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবেন না। চমস্কি বলেন, ইউক্রেনে পুতিনের হামলার বিষয়ে আপনার নৈতিক প্রতিবাদ করা নিশ্চিতভাবে সঠিক। কিন্তু অন্যান্য বর্বরতার সময়ও তার নৈতিক প্রতিবাদ থাকতে হবে।

আফগানিস্তানে লাখ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে। কেন? সেখানে বাজারে খাবার আছে। তবে মানুষের কাছে টাকা না থাকায় তারা কিনতে পারছে না। শিশুরা ক্ষুধার্ত। কেন? এর কারণ যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাজ্যের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র নিউইয়র্কে ব্যাংকে থাকা রিজার্ভ আটকে দিয়েছে।
নোয়াম চমস্কির বই ও লেখালেখি যারা নিয়মিত পড়েন, তারা জানেন- যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির কপটতা ও দ্বিচারিতার জন্য প্রায় সমালোচনা করেন এই বুদ্ধিজীবী।

এদিন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটিশ রাজনীতির সমালোচনা করেন নোয়াম চমস্কি। তিনি বলেন, ‘ব্রেক্সিট একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এটার মানে ভবিষ্যতে যুক্তরাজ্য আরও বেশি করে যুক্তরাষ্ট্রের অধীন হতে বাধ্য হচ্ছে। এটি একটি দুর্যোগ।’ যাই হোক চমস্কি ভবিষ্যতের জন্য আশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এসব পাগলামি বন্ধে তরুণ প্রজন্মের নিবেদিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

শেয়ার করুন!