ডিজিটাল নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমকর্মী আইন কি অশুভ পরিণতির ইঙ্গিত বহণ করছে!



অরুন সরকার/

দেশে বর্তমান রাজনীতির সঙ্কটপূর্ণ অবস্থায় ডিজিটাল নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমকর্মী আইন কি অশুভ পরিণতির ইঙ্গিত বহণ করছে । এনিয়ে জল্পনার শেষ নেই। প্রথমেই সাংবাদিকদের বাকস্বাধীনতা হরণ করতে তৈরী করা হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এখন তৈরী করা হচ্ছে মিডিয়ামালিক কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে। আমরা জানি, বাকস্বাধীনতা হচ্ছে স্বতন্ত্র্য ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের; নির্ভয়ে, বিনা প্রহরতায় বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা, অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যতা ব্যতিরেকে নিজেদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করার সমর্থিত মুলনীতি। অথচ সকল নীতিই আজ ‘গুড়ে বালি!’

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানুষ যেখানে বাক স্বাধীনতায় সংকুচিত হওয়ায় কথা সেখানে এই আইন ছড়াচ্ছে ঘৃণা আর উদ্বিগ্ন। প্রত্যেক শ্রেণী পেশার লোকেরা এই আইনকে প্রত্যাখান করছেন। আইন (সংশোধন)’র যথেষ্ট সূযোগ থাকার পরেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তড়িগড়ি করে এই আইনের খসড়া প্রস্তাব চূড়ান্ত করে। বিভিন্ন মহলের নিন্দা প্রস্তাব থাকা সত্বেও পাহাড়সম এ আইনটি দাঁড় করানো হয়। কথায় আছে ‘‘জোর যার মুল্লুক তার, ক্ষমতা যার নেতৃত্ব তার’’ তাহলে কি সেই নীতিতেই হাটছে আওয়ামী লীগ সরকার?

এরকম লেজে গোবরে অবস্থার মধ্যে এখন ডাক ঢোল বাজানো হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মী আইন। বাকস্বাধীনতার লাগাম টেনে ধরতে আরও একটি কৌশল অবলম্বন করছে কি সরকার? তাদের লক্ষ্য কি এবার মিডিয়া মালিকদের দিকে। শকুনের দৃষ্টি যেমন অনেক উঁচু থেকেও মাটি বা পানির ওপরে থাকা খাবার দেখতে পায় ঠিক তেমই। এর স্বাভাবিক আয়ুষ্কালও যে ২৫ বছর। তবে কি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো গণমাধ্যমকর্মী আইনটিও আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। যদিও নড়েচড়ে বসেছেন মিডিয়ামালিক তথা সংবাদকর্মীরা। এতে কতটুকু সফলতা আসবে তা হয়তোবা কারো জানা নেই। কারন ‘দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার’ অনাদিকাল ধরেই যে চলে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যাচ্ছি আমরা। আমাদের মধ্যেও ভূতুরে ভাব বিরাজ করছে।

এদিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে ১০ ধাপ পিছিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা ফ্রান্সভিত্তিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এর করা সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬২তম অবস্থানে রয়েছে। গত বছর যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫২তম। এছাড়া ২০২০ সালে এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। আর ২০১৯ সালে ছিল ১৫০ তম। যদিও সরকার দলের কর্তারা এ বিষয়টিকে গুরুত্বই দিচ্ছেন না। আর দেশে যে সকল বিরোধীদল রয়েছে তাদের কথায়ও চিড়ে ভিজছে না। বলতে গেলে তারা আজ আঁতুড় হয়ে বসবাস করছেন।

বিরোধীদলের অনেক নেতাকর্মী বলছেন দেশের গণতন্ত্র ও সত্য নির্বাসনে গেছে। লোভ পেয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বাড়ছে হানাহানি। ভোট নিয়ে জাল-জালিয়াতি, দিনের ভোট রাতে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি-মন্ত্রী ও চেয়ারম্যান। এ থেকে বাদ নেই গণমাধ্যমও। কেউ কেউ শাসকদলের হয়ে সাফাই দিচ্ছে আবার কেউ বিরোধীদলের হয়ে কাজ করছে। অথচ তাদের যাতাকলে মধ্যভোগিরা হয়রানির শিকার।

দেশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছে। একবার কি ভেবে দেখেছেন সেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কতটুকু নির্ভুল। সহজ একটি উদাহরণ দেয়া যাক- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে সকল মোকাদ্দমা সৃষ্টি হয়েছে তা আদৌ কি সঠিক পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। এই তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে স্থান, কাল ,বেদ চিহ্নিত করতে পারছে কি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী? ঘটনা ঘটাচ্ছে একদল দুর্বৃত্ত তথ্য সন্ত্রাসীরা আর তার দায়ভার পড়ছে আরেক গোস্ঠির উপর। কোথা থেকে সেই মন্তব্য প্রেরণ করা হয়েছিলো, কে বা কারা করেছিল তা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসবই প্রমাণ করে বর্তমান সময়ে বসে রক্ষনশীল সমাজের কল্পনা করা দূরহ ব্যপার। তাই এরকম কোন আইনের দরকার আছে বলেও মনে হয় না। আগের মতো কোন সাংবাদিকই এখন আর তেমন কোন অনূসন্ধ্যানীমূলক রির্পোট প্রকাশ করতে দেখা যায় না। সর্বদা তাদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে। এই অবস্থায় হুমকির মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যম। এতে সুরক্ষার ভার নেই বললে চলে। তার উপরে প্রশাসনিক দপ্তরে খোলা হয়েছে এক, একটি প্রেস মাধ্যম। ইচ্ছা থাকলেও সত্যতা বের করা বড়ই কঠিন।

দেশ আজ আওয়ামী লীগ সভা নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে একথা নিঃসন্দেহে সত্য। এরকম যেকোন রাজনৈতিকদল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব। এটা কোন স্বপ্ন নয়, বাস্তবতা। শুধু প্রশ্ন থেকে যায় একের পর এক মনগড়া আইন তৈরী করা নিয়ে। অন্য রাজনৈতীকদলগুলোও কি একই পন্থা অবলম্বন করতো। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমকর্মী আইন নিয়ে। বর্তমানে গণমাধ্যমেও রয়েছে বিভাজন। নামে বেনামে গড়ে উটেছে ক্লাব, সংগঠন। “কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ” এতেই বিপত্তি। কেউ কারো ধার ধারেনা। এক কুটিরে না থেকে যে যার মতো করে চলছে। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে ‘একতাই শক্তি একতাই বল।’ যদি গণমাধ্যমকর্মী ও মালিকপক্ষ এক হয়ে কাজ করতো তাহলে হয়তোবা আজ কোন অপশক্তি সামনে এসে রুখে দাঁড়াতে পারতনা। তারপরেও আশা ছাড়তে নারাজ। আত্মবিশ্বাসের জায়গাটুকু রয়ে গেছে দেশ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপর।

লেখক ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন!