ভোটারের আস্থা কিন্তু ফিরল না



এম হাফিজ উদ্দিন খান :

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে প্রত্যাশা-শঙ্কা দুই-ই ছিল। তবে নানা মহলে শঙ্কার দাগটাই ছিল মোটা। এর কারণ বহুবিধ। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ নিয়ে নানা মহলের আপত্তি ছিল। আমি কিছুদিন আগে এ কলামেই এ ব্যাপারে লিখেছিলাম- এই প্রক্রিয়ায় আমাদের সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলরা কতটা দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন কিংবা আমাদের সার্বিক প্রস্তুতিই বা এ ব্যাপারে কতটা রয়েছে। এই প্রশ্ন-শঙ্কার প্রতিফলন ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কিছুটা হলেও দেখা গেছে।

ইভিএমে অনেক ভোটারের আঙুলের ছাপ না মেলার কারণে বিড়ম্বনা পোহাতে হয়েছে এবং সিইসি নিজেও এর বাইরে নন। আমিও একজন ভুক্তভোগী। আমার এক প্রতিবেশীও এ কারণে ভোট দিতে পারেননি। এ রকম অভিযোগ আরও শুনেছি। তা ছাড়া ভোটারের উপস্থিতি প্রায় সব কেন্দ্রেই লক্ষ্য করা গেছে নগণ্য। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রসহ ভোটের সার্বিক পরিবেশ অতীতের চেয়ে ভালো ছিল বলে দাবি করলেও বিভক্ত ঢাকা সিটির মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির দুই প্রার্থী অনিয়মের অভিযোগ সকালবেলাতেই উত্থাপন করেন। তারা তাদের এজেন্ট লাঞ্ছিত হওয়াসহ বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তাদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

এই নির্বাচন ছিল ইসির সামনে অগ্নিপরীক্ষা। আস্থার সংকট কাটাতে ইসির করণীয় কী- এ ব্যাপারেও বিভিন্ন মহল থেকে পরামর্শ উপস্থাপন করা হয়েছিল। ভোটারের নগণ্য উপস্থিতির পেছনে আস্থার সংকট বড় একটি কারণ। তা ছাড়া ভোটারের মধ্যে নানা রকম শঙ্কাও বিরাজ করছিল। ‘এমন ভোট আমরা চাইনি’- সিইসির এ বক্তব্যের মধ্যেই প্রশ্নমুক্ত ভোটের যে জনপ্রত্যাশা ছিল, এর উত্তর নিহিত রয়েছে। ইভিএম পদ্ধতি বোঝানোর নামে ভোটকক্ষে, অর্থাৎ বুথে আওয়ামী লীগ কর্মীর উপস্থিতির যে খবর শোনা গেছে, তাও অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত, একই সঙ্গে প্রশ্নবোধকও। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্নিষ্ট মহলের কর্মকাণ্ডে গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ করার যে অভিযোগ ক্রমেই পুষ্ট হলো, তা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা। সারাদেশের মানুষের দৃষ্টি ছিল এই নির্বাচনের দিকে। বিদেশিদেরও দৃষ্টি কম ছিল না। বিগত জাতীয় নির্বাচনের তুলনায় বিভক্ত ঢাকার সিটি করপোরেশনের ভোটের প্রচার-প্রচারণা অনেক ক্ষেত্রেই নির্বিঘ্ন থাকলেও শেষ পর্যন্ত ভোট গ্রহণ পর্বে সেই ধারা অব্যাহত থাকেনি। ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভোটকেন্দ্রমুখী না হওয়াটাও কোনো সুবার্তা বহন করে না। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনে ইসি সাংবিধানিক দায়িত্ব প্রশ্নমুক্তভাবে পালন করতে পেরেছে কিনা- নতুন করে এ প্রশ্নটাই উঠল।

বড় ধরনের কোনোরকম সংঘাত-সংঘর্ষ ছাড়া এই নির্বাচন সম্পন্ন হলেও ভোটারের আস্থা ফেরানোর যে সুযোগটা ইসির সামনে ফের এসেছিল, তা তারা কাজে লাগাতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। আমরা অনেকেই বলেছিলাম, এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কতটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আমি একটা দৃষ্টান্ত দিই। আমার নিকটস্থ ভোটকেন্দ্রে যে চিত্র প্রত্যক্ষ করেছি, তা প্রত্যাশিত ছিল না। শুধু ভোটারের হতাশাজনক অনুপস্থিতিই নয়, বিরোধী পক্ষের উপস্থিতিও কোনো ক্ষেত্রে লক্ষ্য করিনি। একটি ভোটকেন্দ্রে সব পক্ষের এজেন্ট থাকবেন, কেন্দ্রের পাশে তাদের ক্যাম্প থাকবে, কর্মী-সমর্থকরা থাকবেন- এটিই খুব স্বাভাবিক। কিন্তু যা দেখলাম, সবই একপক্ষীয়। অর্থাৎ আরেকটি ‘ভোট পরীক্ষা’র যে কথা সংবাদমাধ্যমসহ নানা মহল থেকে বলা হয়েছিল, এর ইতিবাচক প্রতিফলন কতটা ঘটেছে- প্রশ্ন উঠেছে এ নিয়েও। গণতন্ত্রে নির্বাচনকে উৎসবে রূপ দেওয়ার নজির বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু আমরা সে রকমটি দুর্ভাগ্যবশত কী কারণে এখন আর তেমনভাবে প্রত্যক্ষ করতে পারছি না- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থ ও প্রয়োজনেই।

আমি অতীতেও বলেছি, যে কোনো নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুখ্য নিয়ামক শক্তি হলেন ভোটার। আর নির্বাচন কমিশন ও তাদের সহযোগীদের মুখ্য দায়দায়িত্ব হচ্ছে ভোটারের ভোটাধিকার সুরক্ষা করা। কিন্তু তা করতে দায়িত্বশীলরা অতীতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন বলেই আজ নির্বাচন নিয়ে এত নেতিবাচক কথা। ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলাটা মোটেও স্বস্তির কোনো বিষয় নয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে যেভাবে অনিয়ম হয়েছে, তাতে ইসি ও আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থা হ্রাস পেয়েছে। এ পরিস্থিতির সৃষ্টি একদিনে হয়নি। সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীলদের নানা রকম ব্যর্থতা, স্ববিরোধিতা, যথাসময়ে প্রয়োজনীয় কাজটি করতে না পারা, নিজেদের পক্ষপাতদোষে দুষ্ট হওয়ার মতো কাজ করার নানা রকম নজির রয়েছে। তারপরও প্রত্যাশা ছিল, তাদের দুর্নাম তারাই ঘোচাবে কথা নয় কাজের মধ্য দিয়ে, উপযুক্ততার প্রমাণ দিয়ে। তারা কি তা পেরেছেন? আমরা এ প্রশ্নের নানা রকম ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ পাব। অতীতেও পেয়েছি। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ দায়িত্বশীলদের আমলে না নেওয়ার মতো অপপ্রবণতাও অতীতে লক্ষ্য করা গেছে। এই অপসংস্কৃতির গণ্ডিমুক্ত হতে না পারাটাও আমাদের অমঙ্গলের কারণ।

গত ২১ দিনে এই নির্বাচনকে উপলক্ষ করে প্রচারাভিযান চলাকালে আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ প্রতিপক্ষের ওপর হামলা-আক্রমণের যেসব ঘটনা ঘটেছে, এর কি কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার ইসি করতে পেরেছে? এ প্রশ্নের জবাবও নয় প্রীতিকর। অথচ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ কিংবা প্রশ্নমুক্ত করার জন্য ইসির কাছে সংবিধান-প্রদত্ত ক্ষমতা তো কম নেই। ইসির দায়িত্বশীলদের কাছে তো সরকারি কর্মকর্তাদের মতো আচরণ প্রত্যাশিত নয়। সরকারি কর্মকর্তারা সরকারের আদেশ পালন করেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনার সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত বিধায় তাদের কার্যক্ষমতা স্বাধীন। সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অবাধ, স্বচ্ছ ভোট আয়োজন কিংবা সম্পন্নকরণে তাদের কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকারও কথা নয়। সিইসি বারবার এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হবে। তিনি ও তার সহযোগীরা তা কতটা করতে সক্ষম হয়েছেন- এ প্রশ্নের বিশদ ব্যাখ্যা এ মুহূর্তে, অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়াটা একটু কঠিন। কারণ, এখন পর্যন্ত বহু বিষয় আমাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তবে এ কথা বলা যায়, প্রত্যাশামতো নির্বাচন তারা আমাদের উপহার দিতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রেই ‘প্রশ্ন’ এবং ‘কিন্তু’ শব্দ দাঁড়িয়েছে।

আবারও বলি, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের হাতে যেটুকু ক্ষমতা রয়েছে, এর যথাযথ প্রয়োগ ও সংবিধান-প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তারা যদি নির্মোহ অবস্থান নিয়ে দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে নিষ্ঠ থাকে, তাহলে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন করা যে মোটেও কঠিন কিছু নয়- এ দৃষ্টান্ত তো আমাদের দেশেই রয়েছে। যে কোনো নির্বাচনে প্রার্থীর হারজিত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই হারজিতটা যদি স্বচ্ছতার নিরিখে কিংবা মানদণ্ডে নির্ণিত হয়, তাহলে কোনো প্রশ্ন থাকে না। নির্বাচন প্রক্রিয়া তো নির্দিষ্ট দু-একটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া বিস্তৃত। কাজেই আজ যে নির্বাচন হলো, এই নির্বাচনের আগাগোড়া কার্যক্রম বিশ্নেষণের ধাপ এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত বাকি রয়ে গেছে। তাই এর চূড়ান্ত বিশ্নেষণ এখনই সম্ভব নয়। তবে অনিয়মের যেসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেসব যেন থেকে না যায় প্রতিকারহীন। যদি তাই হয়, তাহলে তা হবে আরও বেশি অমঙ্গলজনক। একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া কিংবা ব্যবস্থা প্রশ্নমুক্ত করতে সংশ্নিষ্ট সব পক্ষেরই দায় কমবেশি রয়েছে। কিন্তু বড় দায় যে ইসির, এটা ভুলে না গেলেই মঙ্গল। যারা সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন, তাদের দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তা ছাড়া তাদের মতো পদে যারা অধিষ্ঠিত, তাদের এসব বিষয়ে মনে করিয়েই বা দিতে হবে কেন? আমরা আশা করি, নির্বাচনকেন্দ্রিক ফের যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হলো, এর সুরাহা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলরা করতে সক্ষম হবেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

শেয়ার করুন!