করোনা-সংকট, কৃষক কি এমন প্রণোদনা চেয়েছিল



নুরুল আলম মাসুদ /

বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, বাংলাদেশের এখনও শতকরা ৮৭ ভাগ গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। দুই-তৃতীয়াংশ গ্রামীণ পরিবার কৃষি ও অকৃষিজ উভয় আয়ের ওপর নির্ভরশীল। শহরে বসবাসকারীদের মধ্যেও ১১ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত। বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপের (২০১৩) হিসাবমতে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৫.৭ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু করোনার আগ্রাসন থেকে রেহাই পায়নি কৃষি খাতও। পরিবহন লকডাউন এবং আঞ্চলিক লকডাউনের কারণে পণ্যবাজার সংকুচিত হয়েছে, কৃষক তার উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারছেন না আবার উপকরণ সরবরাহে অপ্রতুলতায় আগামীতে উৎপাদন কমে আসারও শঙ্কা রয়েছে। তাতে আগামী দিনগুলোতে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। গত ৭ এপ্রিল জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে করোনা প্রভাব, এতে ব্যাপকভাবে খাদ্যাভাব দেখা দেবে বিশ্বব্যাপী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, সে রকম অবস্থা হতে পারে।’ তাই কৃষিই হতে পারে একমাত্র আন্তঃসম্পর্কিত খাত। আসন্ন মন্দায় জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

চলতি করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে গত ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার ঘোষণা দেন। এই প্রণোদনা কৃষকদের আদতে কাজে আসবে কিনা সেই বিতর্ক পরে; কিন্তু সরকার যে কৃষকদের নিয়ে ভেবেছে তার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

প্রথমত, এই প্রণোদনা কৃষকদের জন্য রাষ্ট্রীয় কোনো অনুদান বা আর্থিক সহায়তা নয়। এটি কৃষি খাতে ৫ শতাংশ সুদে ঋণ; কৃষকরা চাইলে এই তহবিল থেকে ঋণ নিতে পারবে। মজার বিষয় হলো, ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বড় উদ্যোক্তাদের জন্য ঘোষিত চারটি প্যাকেজের সুদের হার ২ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে। অথচ ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য ৫ শতাংশ সুদের হার তাদের জন্য গলার কাঁটার মতো বিঁধে যাবে। তাই কৃষকদের জন্য সুদের হার সর্বনিম্ন ২ শতাংশ করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা ঘোষণাকালে বলেন, আগামী বাজেটে সারের ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিগত পাঁচ বছরের বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি গত পাঁচ বছর ধরেই রাখা হচ্ছে। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে দেখা যায়, বরাদ্দের ৩০ শতাংশ টাকাই কম খরচ করা হয়েছে। তাই এবারও ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও আদতেই কত টাকা কৃষকের ভর্তুকির জন্য খরচ করা হবে, সেই সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

আর কয়েক দিনের মধ্যে বোরো ধান কাটা শুরু হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এ বছর ২ কোটি ৪ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদিত হবে। সরকার ইতোমধ্যে ৬ লাখ টন ধান এবং ১১ লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরবর্তী সময় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে আরও দুই লাখ টন বেশি ক্রয়ের ঘোষণা দেন। তাতে সব মিলিয়ে ১৯ লাখ টন চাল ও ধান ক্রয় করবে। এটি মোট উৎপাদিত বোরোর ১০ শতাংশেরও কম? তাহলে বাকি ৯০ শতাংশ ধান কোথায় যাবে, তার জন্য কৃষকরা কি ন্যায্যমূল্য পাবেন?

দেশে অঘোষিত লকডাউন চলার কারণে বোরো ধান কাটা, ঘরে তোলা, চাতালে আনা এবং সরকারি গুদাম পর্যন্ত নিয়ে আসা নিয়ে নিদারুণ শঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে ধান কাটার জন্য এক এলাকার শ্রমিক যদি অন্য এলাকায় যেতে না পারে, তাহলে ব্যাপকভাবে শ্রমিক সংকট দেখা দেবে এবং কোনো কোনো এলাকায় দৈনিক মজুরি অনেক বেড়ে যেতে পারে। এদিকে মিল মালিকরা বলতে শুরু করেছেন, ধান কাটা শুরু হলে এবং সরকার ধান ক্রয় শুরু করলে ধানের দাম পড়ে যাবে। তাই খুব জরুরিভাবে সরকারকে ধানের আগাম মূল্য এবং ধান কাটা শ্রমিকদের জন্য দৈনিক নূ্যনতম মজুরি ঘোষণা করা উচিত। তাতে ক্ষুদ্র কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাবেন।

এই মুহূর্তে কৃষকের হাতে কোনো টাকা নেই। ফলে বোরো ধান কাটার জন্য শ্রমিকদের টাকার পরিবর্তে ধান দিয়ে পারিশ্রমিক শোধ করা হতে পারে। সরকারের ধান ক্রয় নীতিমালায় উপযুক্ত প্রমাণসাপেক্ষে সেই শ্রমিকরা যেন তাদের ধান সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারে, তার নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে।

সরকারের এই কৃষি প্রণোদনাটির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন একটি স্কিম গঠন করবে এবং মূলত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু কোন খাতে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, কোন ধরনের কৃষক এই প্রণোদনা পাবে, তার কোনো নির্দেশনা এখনও পাওয়া যায়নি। তাই ছোট ও প্রান্তিক কৃষকরা যেন এই প্রণোদনার সুবিধা নিতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় এমন অনেক কৃষক রয়েছেন যারা বর্গাচাষ করেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক কৃষি কাজ করেন এবং কৃষি সম্পর্কীয় কাজ করেন। মনে রাখতে হবে, আমাদের খাদ্য চাহিদার ৯০ শতাংশ জোগানদাতার ৯৩ শতাংশ ক্ষুদ্র ও ভূমিহীন কৃষক। সুতরাং তাদের জন্য কোনো ধরনের সুদ ছাড়াই খানাভিত্তিক আয় ধরে নগদ অর্থ সহায়তা দিতে হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন কৃষিপণ্য বাজারে আসে এবং কৃষকদের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় মৌসুম। এই দুই মাসে কৃষকের উৎপাদিত সব পণ্যের লাভজনক মূল্য, সহজ বিপণন কৌশল এবং পরবর্তী ফলনের জন্য উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

লকডাউনের কারণে সংকটে পড়েছেন দুগ্ধ খামারিরাও। ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন জায়গায় হাঁড়ি হাঁড়ি দুধ পুকুরে ঢেলে দিয়েছেন, প্রতিবাদ করেছেন। একইভাবে সংকটে পড়েছেন পোলট্রি খামারিরা। ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম একদমই পড়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে আপাতত ত্রাণ হিসেবে চালের সঙ্গে আলু, গম, ডিম ইত্যাদি দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি করোনাকালীন সময়ে দুগ্ধ ও ব্রয়লার খামার পরিচালনার জন্য এককালীন নগদ ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রদান করা যেতে পারে।

প্রতিটি সংকটই আমাদের সামনে একটি সুযোগ উপস্থাপন করে। করোনাভাইরাস শিল্পভিত্তিক বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রায় ধসিয়ে দিলেও আমাদের দেখিয়েছে এই অন্তর্বর্তী পরিস্থিতি এবং অদূর ভবিষ্যতেও কৃষিই আমাদের টিকিয়ে রাখার একমাত্র বিকল্প হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক, সরকার এই অবস্থার মধ্য দিয়ে খাদ্য অধিকার গুরুত্ব, খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষকদের অবদান এবং কৃষি খাতে সরকার আরও বেশি স্বাবলম্বী হওয়ার মূল্য উপলব্ধি করবে।

সাধারণ সম্পাদক, খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানি), বাংলাদেশ
masud@pranbd.org

শেয়ার করুন!