জনকণ্ঠ সম্পাদক আতিকউল্লাহ খান মাসুদের মহাপ্রয়াণ



ফাইল ছবি।
বিশেষ প্রতিনিধি :

দৈনিক জনকণ্ঠের সম্পাদক এবং গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবারের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ আর নেই। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সোমবার ভোরে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী শামীমা এ খান, দুই ছেলে মিশাল এ খান ও জিশাল এ খান, এক পুত্রবধূ, এক নাতি ও এক নাতনিসহ বহু আত্মীয়স্বজন ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি ১৯৫১ সালের ২৯ আগস্ট মুন্সীগঞ্জ জেলার মেদিনী মন্ডল গ্রামে সম্ভ্রান্ত খান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

রাজধানীর ক্যান্টনমেন্টের নিজ বাসভবনে অসুস্থতা বোধ করলে ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁকে নিকটস্থ এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর।

সকালে মৃত্যুর সংবাদ শুনেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আতিকউল্লাহ খান মাসুদের বাসায় ফোন করেন। এ সময় তিনি আতিকউল্লাহ খান মাসুদের ভগ্নিপতি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খানের সঙ্গে ১৫ মিনিট কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার কাছ থেকে মরহুমের পরিবারের খোঁজ খবর নেন। মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, এমপি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

শোক বার্তায় রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের অনুসারী আতিকউল্লাহ খান মাসুদের মৃত্যুতে জাতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তির বাতিঘরকে হারাল। সংবাদপত্র প্রকাশনার জগতে মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ দিয়েছেন নতুন মাত্রা। তাঁর মৃত্যুতে দেশ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার একজন মহান মুক্তিযোদ্ধাকে হারাল। তিনি নতুন প্রজন্মের সংগঠক ও উদ্যোক্তাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।

আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে একজন সজ্জন ও ভীষণ সহসী মানুষ হিসেবে আখ্যায়িত করে শোক বার্তায় আরও বলা হয়, তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ ও এদেশের স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি একজন বুদ্ধিবৃত্তিক পুরোধাকে হারাল।

সোমবার বাদ জোহর ঢাকা সেনানিবাসের আল্লাহু মসজিদে মরহুমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি এবং আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান উপস্থিত ছিলেন। আলাপকালে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক আতিকউল্লাহ খান মাসুদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং ২০০১ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে দৈনিক জনকণ্ঠের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন।

জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ দৈনিক জনকণ্ঠ ভবনে আনা হয়। দুপুর ২টার দিকে মরহুমের লাশ দৈনিক জনকণ্ঠে আনা হলে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরে মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়। বর্তমানে মরহুমের বড় ছেলে মিশাল এ খান রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। সেখান থেকে তিনি দেশে এলে আতিকউল্লাহ খানের দাফন সম্পন্ন হবে।

অত্যন্ত সাহসী আতিকউল্লাহ খান মাসুদ যুব বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে ২নং সেক্টরের অধীনে মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানা কমান্ডার হিসেবে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেন এবং অনেক বড় বড় অপারেশনে অংশ নেন। বিশিষ্ট এই মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে ১৯৭২ সালে সফলভাবে বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করে কর্মজীবন শুরু করেন। তৎকালীন সফল তরুণ শিল্পপতিদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তিনি বিভিন্ন শিল্প-কারখানা গড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন।

১৯৭৮ সালে তিনি সাফল্যের সঙ্গে জাপানের কারিগরি সহযোগিতায় গ্লোব ইনসেক্টিসাইডস লিঃ নামে দেশের প্রথম মশার কয়েল প্রস্তুতকারী শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ধোঁয়াবিহীন মশা নিবারক গ্লোব ম্যাট ও তেলাপোকা ধ্বংসকারক গ্লোব এ্যারোসল এই দুটি পণ্য এই কারখানায় উৎপাদন শুরু করা হয়। ১৯৯০ সালে গণচীনের কারিগরি সহযোগিতায় গ্লোব মেটাল কমপ্লেক্স লিঃ নামে আরও একটি ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৯৩ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং সফল শিল্পপতি হিসেবে তার জীবনের সবচেয়ে সফল সংযোজন দেশের অন্যতম এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক জনকণ্ঠ’ প্রকাশ করেন। ১৯৯৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সম্পাদক, মুদ্রাকর ও প্রকাশক হিসেবে তিনি এই জাতীয় দৈনিকটি সর্বপ্রথম অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সমন্বয়ে ঢাকাসহ দেশের ৫টি স্থান থেকে একই সঙ্গে প্রকাশ করে দেশের সংবাদপত্র শিল্পে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার সুযোগ্য নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতায় খুব দ্রুতই জনকণ্ঠ দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনায় পরিণত হয়। প্রকাশের তিন বছরের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে সর্বজনস্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য পত্রিকা হিসেবে দেশের শীর্ষস্থান দখল করতে সক্ষম হয়। পত্রিকাটি প্রকাশ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ এবং প্রচার করে আসছে। পাশাপাশি পত্রিকাটি সব সময় স্বাধীনতাবিরোধীদের বিপক্ষে সরব অবস্থানে রয়েছে। তার অন্যতম প্রকাশনা হচ্ছে ‘সেই রাজাকার’। এই বইটি দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ১৯৯৭ সালে ডেইরি ও কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য গ্লোব খামার প্রকল্প নামে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ১৯৯৮ সালে দেশের গৃহায়ন সমস্যা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য গৃহায়ন সমস্যা সমাধানকল্পে গ্লোব কনস্ট্রাকশন লিঃ নামে আরও একটি গৃহনির্মাণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০০ সালে তার প্রতিষ্ঠিত সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সমন্বয়কারী হিসেবে গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনি নিজস্ব সাংগঠনিক মেধা ও প্রশাসনিক দক্ষতার গুণে প্রতি বছর দেশের কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে দেশে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং দেশে উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে অদ্যাবধি কয়েক হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। বর্তমানে ‘গ্লোব জনকণ্ঠ শিল্প পরিবার লিমিটেড’ অবস্থানগতভাবে বাংলাদেশে সফল, সুপরিচিত ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত।

জন্মলগ্ন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সপক্ষে এবং নীতির প্রশ্নে আপসহীন দৈনিক জনকণ্ঠ যে সাহসী ভূমিকা এ যাবত পালন করে আসছে তা সহ্য করতে না পেরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী সেই চক্র ওয়ান ইলেভেনের শুরুতেই অর্থাৎ ২০০৭ সালের ৭ মার্চ মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদকে জনকণ্ঠ ভবন থেকে রাত ১০টায় গ্রেফতার করে ৪২টি মিথ্যা মামলা দিয়ে ৪৫ কোটি টাকা জরিমানা এবং ৪৮ বছর কারাদ- প্রদান করে দীর্ঘ ২২ মাস ১২ দিন কারান্তরীণ রাখে। গণতন্ত্র ফিরে এলে ২০০৯ সালের ২০ জানুয়ারি তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

আতিকউল্লাহ খান মাসুদ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন। ১৯৮৪-৮৬ সালে তিনি ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাবের সহ-সভাপতি ও ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮৫-৮৬ সালে গরিব ও অনাথ শিশুদের বিনা খরচে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্য ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি বিক্রমপুরের লৌহজং মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন।

শেয়ার করুন!