শ্রীলঙ্কা সফরে সিরিজের প্রথম টেস্ট ড্র করল বাংলাদেশ



ক্রীড়া ডেস্ক :

অবশেষে টানা ব্যর্থতার ফাঁড়া কাটাল বাংলাদেশ দল। শ্রীলঙ্কা সফরে সিরিজের প্রথম টেস্টেই ড্র করল বাংলাদেশ। এই ড্রয়ের ফলে প্রথমবারের মতো ২০ পয়েন্ট অর্জন করল বাংলাদেশ। রবিবার ক্যান্ডি টেস্টের পঞ্চম ও শেষদিনে লড়াই জমে ওঠে। লাঞ্চ পর্যন্ত ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ৩০ ওভারে ৫ উইকেটে ১৩৬ রান তুলে প্রথম ইনিংস ৮ উইকেটে ৬৪৮ রানে ঘোষণা দেয় শ্রীলঙ্কা। ১০৭ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে দলীয় ২৭ রানেই ২ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ের শঙ্কা জাগে বাংলাদেশ দলে। কিন্তু তামিম ইকবালের ৯৮ বলে করা ৭৪ রানের হার না মানা ঝড়ো ইনিংসে শেষ পর্যন্ত ড্র হয়ে যায়। ২ উইকেটে বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে ১০০ রান তোলার পর বৃষ্টিতে আর খেলা হয়নি। শেষ পর্যন্ত উভয় দলই ড্র মেনে নেয়। এর মাধ্যমে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম কোন ম্যাচে হার এড়িয়েছে বাংলাদেশ এবং পেয়েছে প্রথম পয়েন্ট। আগের ৫ টেস্টেই হার দেখার পর আইসিসি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে স্বস্তির ড্র করল বাংলাদেশ দল।

টেস্টের পঞ্চমদিনে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ধস নামার ভয়ানক কিছু স্মৃতি আছে। গত কয়েক বছরেই বেশ কয়েকবার পঞ্চমদিনে ভয়াবহ ব্যাটিং দুর্দশা দেখেছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। ২০১৯ সালে ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের বিপক্ষে পঞ্চমদিনে ৩৭ রানে ৪ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। একই বছরে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে ১২৯ রানে ৭ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে ২০১৭ সালে ৪১ রান তুলতেই ৭ উইকেট হারানোর ঘটনাও আছে। দলীয় ২১ রানে সাইফ হাসান (১) ও দলীয় ২৭ রানে নাজমুল হোসেন শান্ত (০) সাজঘরে ফেরার পর সেই দুঃসহ স্মৃতিগুলোই ফিরে আসছিল। তবে তামিম প্রথম ইনিংসের মতোই ব্যাট হাতে তা-ব চালিয়ে গেছেন। প্রথম ইনিংসে ৫৩ বলে অর্ধশতক হাঁকিয়েছিলেন, এবার হাঁকান ৫৬ বলে। দলীয় রানও তখন মাত্র ৫২। এতেই বোঝা যায় লঙ্কান বোলারদের ওপর কতটা ঝড় বইয়ে দিয়েছেন তামিম। টেস্ট ম্যাচের পঞ্চমদিনে এমন ঝড়ো ব্যাটিং করা বেশ কঠিন। তবে তার এই কঠিন সময়ে সাবলীল ব্যাটিংয়েই বিপদ ভুলে গেছে বাংলাদেশ দল, কাটিয়েও উঠেছে। অন্যপ্রান্তে অধিনায়ক মুমিনুল দারুণ সঙ্গ দিয়েছেন তাকে। ২ উইকেটে ১০০ রানে পৌঁছার পর বৃষ্টি নামে তুমুল বেগে। পরে আর খেলা হয়নি। আরেকটি সেঞ্চুরির আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ৯৮ বলে ১০ চার, ৩ ছক্কায় ৭৪ রানে অপরাজিত থাকেন তামিম। ওয়ানডে ও টি২০ ক্রিকেটে দেশের পক্ষে সর্বাধিক রান সংগ্রাহক তামিমকে টেস্টে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন মুশফিকুর রহিম। এই ইনিংসে এখন আবার টেস্টেও শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেয়েছেন তামিম। আর মুমিনুল দারুণ ধৈর্য দেখিয়ে ৮৬ বলে ২৩ রানে অপরাজিত থাকেন। তাই অবশেষে ড্র করতে সক্ষম হয় বাংলাদেশ।

এর আগে চতুর্থদিন শেষে ৩ উইকেটে ৫১২ রান তুলে মাত্র ২৯ রানে পিছিয়ে ছিল শ্রীলঙ্কা। এরপরই তারা জানিয়েছিল পঞ্চমদিন দ্রুত কিছু রান তুলে জয় তুলে নিতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে তারা। সেটি তারা করেও দেখিয়েছে ব্যাটিংয়ে নামার পর। লাঞ্চ বিরতির আগে পর্যন্ত ৩০ ওভারে ৫ উইকেট হারালেও ১৩৬ রান যোগ করে তারা। ৩৪৫ রানের জুটি ভেঙ্গে যায় করুনারত্নে ও ধনঞ্জয়ার। ২৯১ বলে ২৫ চারে ১৬৬ রান করার পর ধনঞ্জয়াকে বোল্ড করে দেন তাসকিন আহমেদ। ডানহাতি এ পেসারই ছিলেন কিছুটা বাংলাদেশী বোলারদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তিনি গতির ঝড়ে বেশ সমস্যায় ফেলতে পেরেছেন লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের। এক ওভার পরেই আবার ডাবল সেঞ্চুরিয়ান করুনারত্নেকে সাজঘরে পাঠিয়েছেন তাসকিন। ৪৩৭ বলে ২৬ চারে ২৪৪ রান করে সাজঘরে ফেরেন ক্যারিয়ারসেরা ব্যাটিং করা করুনারত্নে। দ্রুতই পাথুম নিশাঙ্কাকে (১২) সাজঘরে পাঠিয়ে দেন এবাদত হোসেন। পঞ্চমদিনে মাত্র ৪১ রানের মধ্যেই ৩ স্বীকৃত ব্যাটসম্যানকে সাজঘরে পাঠিয়েও স্বস্তি আসেনি বাংলাদেশ তাঁবুতে। কারণ ততক্ষণে লিড পেয়ে গেছে লঙ্কানরা। সেটিকে আরও বড় করেন নিরোশান ডিকভেলা ৩৩ বলে ৩১, হাসারাঙ্গা ডি সিলভা ৫৫ বলে ৩ চারে ৪৩ ও লাকমল ৩১ বলে ১ ছয়ে অপরাজিত ২২ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে। ৮ উইকেটে ৬৪৮ রান তুলে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে তারা। ১০৭ রানের লিড পায় শ্রীলঙ্কা। ৪ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে তাসকিন করেন ক্যারিয়ারসেরা বোলিং। তিনি ক্যারিয়ারের দশম টেস্টে নেমে ১১২ রানে নেন ৩ উইকেট।

২০১৪ সালের পর টানা ২৮ টেস্টে শ্রীলঙ্কায় ফলাফল হয়েছে। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় ড্র করে দক্ষিণ আফ্রিকা, ম্যাচটি কলম্বোয় হয়েছে। আর পাল্লেকেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সর্বশেষ ড্র করে পাকিস্তান ২০১২ সালের জুলাইয়ে। তারপর গত ৪ টেস্টেই রেজাল্ট হয়েছে এ ভেন্যুতে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে টেস্ট ড্র করেছিল বাংলাদেশ। সেটিও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে চট্টগ্রামে। মাঝে গত ৩ বছরে ১৬ টেস্টে ৪ জয়, ১২ হার। ড্র হয়নি কোন ম্যাচ। এরচেয়ে বড় বিষয় গত দুই বছরে ৯ টেস্ট হেরেছে বাংলাদেশ। বিদেশের মাটিতে সর্বশেষ ড্র ২০১৩ সালে। আশ্চর্যজনকভাবে সেই ড্র ম্যাচটিও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গলে হয়েছে। এরপর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২ টেস্ট হারলেও একটি জেতে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে নিজেদের ঐতিহাসিক শততম সেই টেস্টে জয়ের পর বিদেশের মাটিতে টানা ৯ টেস্ট হেরেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ৭ টেস্টেই ইনিংস ব্যবধানে পরাজয়। এছাড়া গত দুই বছরে দেশে-বিদেশে ১০ টেস্ট খেলে মাত্র ১ জয়ের বিপরীতে ৯টি হার দেখতে হয়েছে। আর অধিনায়ক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর ৬ টেস্টের একটিতে জয় পেলেও বাকি ৫ টেস্টে হেরে যায় বাংলাদেশ। সবমিলিয়ে স্বস্তির একটি ড্র অবশেষে পেয়েছে বাংলাদেশ ও মুমিনুল। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও প্রথম পয়েন্টের মুখ দেখেছে। ৬ ম্যাচে বাংলাদেশের পয়েন্ট ২০। এর আগে আইসিসি চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে ভারতের কাছে ২, পাকিস্তানের কাছে ১ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ২ টেস্ট হেরেছে বাংলাদেশ। আর শ্রীলঙ্কার পয়েন্ট ১১ টেস্টে ১৪০। তারা ৬টি হেরেছে, ৪টি ড্র করেছে এবং ১টি জিতেছে।

শেয়ার করুন!