রোজিনার কপালেই ছিল নির্যাতন-নিপিড়ন, অতঃপর….কারাভোগ!



প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম, ছবি-সংগৃহীত।
অরুন সরকার  //

প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলাম সত্যেই কি তিনি নথি চুরি করেছেন নাকি গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। তাকে নিয়ে বর্তমানে দেশে-বিদেশে চলছে তুলকালামকান্ড। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তোলপাড়। প্রকাশ্যে দিবালোকে তাকে চুর সাজিয়ে সচিবালয়ের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কতৃপক্ষ নিজেদের আত্মরক্ষার ফন্দি আটছে কোনটি? এমন একজন নারীর উপরে চুরির অপবাদ কেউ মানতে নারাজ। অথচ এর আগে ওই নারী সাংবাদিক সচিবালয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে একাধিক অনুসন্ধানি প্রতিবেদন করেছিলেন। এই ঘটনায় পুরো জাতি আজ হতভম্ব।

এবার আসা যাক একটু মূল আলোচনায়। ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যালোচনা করে দেখা যায় ঘটনার দিনের বেশ কয়েকটি খন্ড খন্ড ভিডিও চিত্র ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা মিলে ওইদিন তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। সেখানের দায়িত্বরত একজন মহিলা সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরেও রোজিনার অনুমতি না নিয়ে মুটোয়ফোনে বিষয়টি ভিডিও ধারণ করছেন। তার গলায় চেপে ধরেছেন। তাও আবার থানা পুলিশের সামনে। ব্যক্তি মতকে উপেক্ষা না করে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকে আটকে রেখে হেনাস্তা ও চরিতার্থ করতে তার ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। তার উপরে চালানো হয়েছে নির্যাতন। এ কোন সভ্যতা? যা মুটেই আইনসিদ্ধ নয়। তবে রহস্যজনক হলেও সত্য যে, ঘটনার পর কেড়ে নেয়া হয় রোজিনা ইসলামের ব্যক্তিগত মুটোয়ফোন। নিজেদের অনিয়ম দুর্নীতি ঢাকতে সেই মুটোয়ফোনটি প্রথমে রেখে দেয় স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়ের কথিত কর্মকর্তারা। পুলিশ পৌছাবার আগেই সেই মুটোয়ফোন দিয়ে কি যেনও জজ মিয়া নাটক সাজালো ওই কর্তারা তা থেকে যাচ্ছে আইনের ধরাচোয়ার বাইরে। আইনের উর্ধ্বে কেউ নয়, তাহলে কেন মুটোয়ফোনটি পুলিশ সরেজমিনে গিয়ে উদ্ধার করতে পারল না? আর উদ্ধার হলে সেই ভিডিও ধারনের সময় কেন সেটা দেখা গেল না? এর মানে রোজিনা ইসলামের ব্যক্তিগত মুটোয়ফোনে যে ছবিগুলো ধারণ করা হয়েছে সেগুলো সেখানের দায়িত্বরত কোন না কোন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এসব চালবাজি করেছেন। এই নাটকের গুরু কে বা কারা ছিলেন তাদেরও খুজে বের করা একান্ত আবশ্যক।

বলা হচ্ছে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩ নম্বর ও ৫ নম্বর ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩৭৯ ও ৪১১ ধারার অপরাধে তাকে আসামি দেখানো হয়েছে। সেখানেও রয়েছে বিশেষ নারকিয়তা। কোন চুর যদি চুরি করে তাহলে সেখানে ছবি তোলার কোন প্রয়োজনই নেই। কারন সেই সময় চুরের সামনেই রাখা ছিল আলামত কেয়ামত করার নথিপত্র। ইচ্ছে করলে রোজিনা ইসলামও সেই নথিগুলো তার ব্যাগ-এ আড়াল করে নিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। সত্যেকার অর্থে কোন চুরই চাইবে না এক মোরগ দু’বার জবাই করা হোক। তাহলে কেন এই সাজানো নাটক? এতে স্পষ্ট যে, রোজিনা ইসলামকে ষড়যেন্ত্রের জালে ফাঁসিয়ে সরকারকে বির্তকিত করতেই এ নাটকিয়তার জন্ম দিয়েছে কতিপয় স্বার্থান্বেষি মহল। তবে আরেকটি বিষয় সবাইকে হতবাক করেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক’র কথায়। তিনি বলেছেন, তার কাছে থাকা ফাইলগুলো ফেরত নেবার জন্য তাকে বড়জোর আধাঘণ্টা আটক রাখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এবং এরপর পুলিশ উপস্থিত হয়ে ঘটনার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে বুঝা গেল সেই চক্রান্তে তিনি অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িত। কারন তিনি পূর্বের অনিয়ম-দুর্নীতি ঢাকতে এই নাটকের বলির পাটা বানাতে চেয়েছিলেন নারী সাংবাদিক রোজিনাকে! বর্তমানে আবার ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিতে ভূইফোর কতিপয় চোরের উপর বাটপাড়ি ইউটিউব চ্যানেল-এর মাধ্যমে রোজিনার বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তের জাল বিস্তার করছেন। তাও ছড়িয়ে ছিঠিয়ে দিচ্ছেন ফেসবুক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এটাও একটি গুরুতর অপরাধ।

এমনিতেই বর্তমানে সারাদেশের মিডিয়াকর্মীরা আতংকে রয়েছেন। তাদের গায়েল করতে তৈরী করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সাইবার হুমকিতে মিডিয়া। এতকিছুর পর রোজিনা ইসলামের লাগাম টেনে ধরতে পরছিলনা এই সেই কুখ্যাত অসাধু কর্মকর্তারা। অবশেষে তারা আলোর মুখ দেখল তাও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে বেকায়দায় ফেলে। যদিও সরকারেরও উচিত ছিল এরকম একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সাংবাদিক নিরাপত্তায় আইন প্রণয়নের। কিন্তু তা না করে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। সেই নীতিমালার প্রত্যেকটি ধারাই মরনঘ্যাতি। যদিও সেই কালো আইন বাতিলে দেশের বিভিন্ন নাগরীক সমাজ ব্যক্তিত্ব আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু রহস্যজনক কারনে সরকারের কোন টনক নড়ছে না। তার উপরে আবার চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে সরকারী নথি চুরির অপবাদ! এরমতো লজ্জা আর কি হতে পারে।

ইতোমধ্যে দেশ নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন। তদুপরি বির্তক পিছু ছাড়ছেনা। সাংবাদিকদের মধ্যেও এনিয়ে রয়েছে মতবিরোধ। চারদিকে শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। সত্য প্রকাশেও মামলা-হামলার ভয়। বর্তমানে যে হারে রোজিনা ইসলামের মুক্তি নিয়ে হাটে-ঘাটে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ করছেন তা যে ক্ষেপন হবেনা এর কোন নিশ্চয়তাও নেই। এদিকে শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন বেশি লাফালাফি করা যাবে না- সাংবাদিকদের এমন শিক্ষা দিচ্ছে সরকার। এ অবস্থায় ‘বিভক্তি’ ছেড়ে সাংবাদিকদের ‘একাট্টা’ হতে হবে। মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। একজোট হয়ে বলেন যে, সাংবাদিক নির্যাতন চলবে না। তাহলে দেখবেন যে, আস্তে আস্তে সম্মান বাড়বে, নির্যাতন কমবে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় তার কথাগুলো কি মনে রাখতে পারবে সেই সাংবাদিক সমাজ?

নীতি নৈতীকতা ও মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে সমাজে অবক্ষয় বাড়ে। এ অবক্ষয়ের আরেক চিত্র ইদানীং সমাজে দেখা যাচ্ছে কোন না কোন ভাবে সাংবাদিক খুন, গুম, নির্যাতন ও হামলা-মামলায় জর্জিত। বিরোধি রাজনৈতীক দলগুলোও হুমকির মুখে। তিল পরিমাণ টাই নেই ভাগ্য পরীক্ষায়। শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শোষণ চালিয়ে যাওয়ার জন্য শোষক-শাসক শ্রেণীর নিজেদের মধ্যে শ্রেণীগত। এ ধরনের ফ্যাসিবাদী শাসন শ্রেণীবিভক্ত সমাজের ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক। ঠিক তেমনি মিডিয়া ক্ষেত্রেও এগুলো বিদ্যমান।

অপরদিকে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের কাছে ‘অপ্রকাশযোগ্য চুক্তির’ নথিপত্র পাওয়া গেছে। অথচ এ মামলায় পুলিশের করা জব্দতালিকায় অপ্রকাশযোগ্য চুক্তির নথিপত্রের বিষয়টিই নেই। তবে আমাদের ভূললে চলবেনা আকাশের যত তারা পুলিশের তত ধারা। ইচ্ছে করলে এই সিন্ডিকেটগ্রুপ পারবেনা এমন কোন জিনিস নেই। তাই সময় থাকতেই কলম সৈনিকদের সোচ্চার হতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক সমাজের ভবিষ্যত ভয়াবহ চিত্র অপেক্ষা করছে। একটি দেশের ক্রান্তি লগ্নে যখন মিডিয়া হাল ধরে ঠিক তখনি সত্যের জয় হয়। কিন্তু আমরা সেই পথে এগোতে পারিনি। কারন নির্যাতনকারীরা সবসময় আমাদের পিছু টানছে। এজন্য তারা অল্পদিনে রাঘব বোয়ালে পরিণত হচ্ছে। তারাই আমাদের গিলে খাচ্ছে। তাই অবিলম্বে তাদের সংস্পর্শ ত্যাগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রত্যেক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির খুজ নিয়ে তাদের জবাব দেন কাগজে কলমে। দেখবেন রহস্যময় সেই তেলাপোকার দৌড়। আপত্তি কোথায় আজ জেলে থাকতে রোজিনার। তার কপালেই ছিল ভাল কৃতকর্মের জন্য নির্যাতন-নিপিড়ন, অতঃপর….কারাভোগ। ভাগ্যবানতো তারা আজ যারা তাকে নির্যাতন চালিয়ে জেলে ঢুকিয়ে বীর দর্পে প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছে।

সম্পাদকীয় কলাম।

শেয়ার করুন!