আনভীরকে ‘সংবর্ধনা’ দেয়া নিয়ে বিভক্ত ক্র্যাব



ফাইল ছবি।
সিএনবাংলাদেশ ডেস্ক :

কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় হওয়া মামলার আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে ‘সংবর্ধনা’ দেয়া নিয়ে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) সদস্যদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে।

ইতোমধ্যে এ ঘটনার প্রতিবাদে সংগঠন থেকে পদত্যাগ চেয়েছেন পারভেজ নাদির রেজা ও মিজানুর রহমান মহিম ওরফে মহিম মিজান নামে দুই সদস্য। তারা দুজনই একাত্তর টেলিভিশনে কাজ করেন।

বৃহস্পতিবার (৩ জুন) সাংবাদিকদের ফেসবুক গ্রুপে ‘ক্র্যাবের সাধারণ সদস্য পদ প্রত্যাহারের খোলা চিঠি’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করেন।

সেখানে পারভেজ নাদির রেজা লিখেন : “প্রিয় সহকর্মী সদস্যবৃন্দ, আমি পারভেজ নাদির রেজা, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ২০০৮ সাল থেকে। আমি মনে করি বর্তমান কমিটি সংগঠনের নাম ব্যবহার করে, তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো সাংবাদিক সমাজকে সাধারণের মানুষের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করেছে। তাদের এই অনৈক্য কর্মকাণ্ডের কারণে আমার পরিবার, স্বজন এবং বন্ধুদের কাছে হেয় হয়েছি। সবারই একটাই প্রশ্ন আমরা, সাংবাদিকরা ব্যক্তিগতভাবে এবং সাংগঠনিকভাবে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছি কি না? তাদের এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নাই? তাই দিতেও পারি নাই। এরপর অনেকে এটাও জানতে চান, এই সংগঠনের সদস্য হিসেবে আমার পকেটে কত টাকা এসেছে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আমরা সবাই আনভীর সোবাহানের টাকার ভাগ পেয়েছি। ফেসবুকে সংগঠনের নাম ‘ক্রাইম সাপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন’ লিখে ট্রল করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিশিষ্টজনরা এ বিষয়ে ফেসবুকে তাদের উষ্মা প্রকাশ করছেন। সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকদের সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরিতে আমার যেসব নেতারা কাজ করেছে তাদের প্রতি একরাশ ঘৃণা। এর চেয়ে বেশি কিছু করার সুযোগ যেহেতু আমার নাই, তাই ঘৃণা জানানোই সবচেয়ে উত্তম বলে মনে করছি।”

এই ক্র্যাব সদস্য আরো লিখেন, “যে নেতারা টাকার নেশায় সময়, প্রেক্ষিত ও মাত্রাজ্ঞান ভুলে যান, তারা নেতৃত্ব দেওয়ারও সব যোগ্যতা হারান। তাই এই কমিটির কোনো সদস্যকেই আর সংগঠনের নেতা হিসেবে মানছি না। তাদের প্রতি অনাস্থা আনলাম। যদি আগামী ৭ দিনের মধ্যে বিশেষ সাধারণ সভা না ডেকে তারা তাদের আস্থাহীনতার ভোটাভুটি না করেন, তাহলে এই কমিটি থাকা অবস্থায় সংগঠনের সাধারণ সদস্য হিসেবে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিলাম। আর যদি তারা আস্থা ভোটে জিতে যান, তাহলে পুরোপরি এই সংগঠন থেকে আমার সাধারণ সদস্য প্রত্যাহার ধরে নিতে হবে। কারণ তখন বুঝে নেবে “সবকিছু নষ্টদের দখলে চলে গেছে বা আমি নিজেই নষ্ট হয়ে গেছি”।

পারভেজ নাদির রেজা লিখেন, “নিয়ম অনুযায়ী এটা আবেদন আকারে সভাপতির কাছে দেওয়ার কথা। কিন্তু গত ২ জুন বর্তমান কমিটি যে কাজ করেছে, তাতে করে তাদের কাছে এমন আবেদন জানাতেও রুচি বোধে বাঁধছে। তাই এটি মূলত সবাইকে অবহিতমূলক খোলা চিঠি।”

এদিকে এ চিঠির কিছুক্ষণ পরই ‘কিছুটা দায়মুক্তি নেয়ার চেষ্টা’ শিরোনামে মিজানুর রহমান মহিম (মহিম মিজান) তার প্রতিক্রিয়ায় লিখেন : “(নিয়ম অনুযায়ী এটা আবেদন আকারে সভাপতির কাছে দেওয়ার কথা। কিন্তু গত ২ জুন বর্তমান কমিটি যে কাজ করেছে, তাতে বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির কাউকেই আর এই সংগঠনের নেতা বলতে ঘৃণাভরে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি। এটি একটি অবহিতমূলকপত্র।) আমি মিজানুর রহমান মহিম (মহিম মিজান) বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ২০০৮ সাল থেকে। আমি মনে করি বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি সংগঠনের নাম এবং সকল সদসস্যের নাম ব্যবহার করে তাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতিবাচক এবং আমার দৃষ্টিতে চরম বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো সাংবাদিক সমাজকে এবং বিশেষ করে ক্র্যাব সদস্যেদের সাধারণের মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছে। তাদের এই অনৈতিক এবং নীতি বিবর্জিত ও চরমমাত্রায় মানহানিকর কর্মকাণ্ডের কারণে আমার পরিবার, স্বজন এবং বন্ধুদের কাছে হেয় হয়েছি, প্রতিনিয়ত হচ্ছি।”

পারভেজ রেজার মতো করে মহিম মিজানও লিখেন, “আত্মীয় স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু, পরিচিত এমনকি অপরিচিতজনরাও প্রশ্ন তুলছে আমরা সংবাদকর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে এবং সাংগঠনিকভাবে টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গেছি কিনা? তাদের এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নাই? তাই দিতেও পারছি না। এরপর অনেকে এটাও জানতে চান, এই সংগঠনের সদস্য হিসেবে আমার পকেটে কত টাকা এসেছে এবং সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আমরা সবাই সম্প্রতি গুলশানের একটি আত্মহত্যার প্ররোচিত মামলার প্রধান অভিযুক্ত একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে টাকার ভাগ পেয়েছি?”

ক্র্যাবের এই সদস্য আরো লিখেন, “সাধারন মানুষের কাছে সাংবাদিকদের সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরিতে আমার যেসব নেতারা কাজ করেছে তাদের প্রতি ঘৃণা জানানোই সবচেয়ে উত্তম বলে মনে করছি। সময়, প্রেক্ষিত ও মাত্রাজ্ঞান ভুলে যান, তারা যেকোনো সংগঠনকে নেতৃত্ব দেওয়ারও সব যোগ্যতা হারান। তাই এই কমিটির কোনো সদস্যকেই আর সংগঠনের নেতা হিসেবে মানছি না। তাদের প্রতি সম্পূর্ণভাবে অনাস্থা আনলাম। যদি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশেষ সাধারণ সভা না ডেকে তারা তাদের আস্থাহীনতার ভোটাভুটি না করেন, তাহলে এই কমিটি থাকা অবস্থায় সংগঠনের সাধারণ সদস্য হিসেবে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিলাম।”

মহিম মিজান আরোও লিখেন, “এই কমিটি থাকা অবস্থায় আমাকে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা, চিঠি, কোনো ধরনের অনুষ্ঠান, এর সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকবে না। এই কমিটি আমাদের সাধারণ সদস্যদের নাম ব্যবহার করে যদি কোনো কিছু এনে থাকে, তাদের সেইসব গ্রহণ করা জিনিস বা টাকা কোনো কিছুর ভাগিদার আমি হবো না। তাদের কোনো ধরনের অপকর্মেরও (যেটা তারা সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে করছেন) ভাগিদার সাধারণ সদস্য হিসেবে আমি হবো না। এমনকি এই কার্যনির্বাহী কমিটি চলমান থাকা অবস্থায় আমি যদি কোনো ধরনের বিপদেও পড়ি, তবুও বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি যেন আমার পক্ষে কোনো ধরনের অবস্থান না নেয়। মোদ্দা কথা হচ্ছে, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি থাকা অবস্থায় ক্র্যাবের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।”

এর আগে গতকাল বুধবার শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় বসুন্ধরার এমডি আনভীরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় ক্র্যাবের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা।

এসময় ক্র্যাবের সহসভাপতি নিত্য গোপাল তুতুর নেতৃত্বে সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আরিফ, যুগ্ম সম্পাদক হাসান-উজ-জামান, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহরিয়ার আরিফ, দপ্তর সম্পাদক ইসমাঈল হুসাইন ইমু, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক রুদ্র মিজান, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রুদ্র রাসেল, কার্যনির্বাহী সদস্য গোলাম সাত্তার রনি, এস এম মিন্টু হোসেন, কাজী জামশেদ নাজিম উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সংগঠনটির সাবেক সভাপতি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পারভেজ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ওরা (আনভীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন যারা) হয়ত ক্র্যাবের স্বার্থেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে সিদ্ধান্তটা খুব একটা ভালো হয়নি। আমি মনে করি না, এটা (সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত) কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে নিয়েছে। এটা হলে সংগঠনের পক্ষ থেকে সবাই মিলে ওরা যেত না। তারপরেও বলবো, এ ধরনের সিদ্ধান্তে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়নি।”

একজন আলোচিত আসামির সঙ্গে সাংবাদিকদের এভাবে দেখা করা কতটুকু নৈতিক ও আইনসম্মত, সে বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ জাগরণ অনলাইনকে বলেন, “যেহেতু সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাকে মামলায় গ্রেপ্তার করেনি, সে ক্ষেত্রে তার সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনায় আইনি কোনো বাধা নেই। তবে যারা তাকে (আনভীর) সংবর্ধনা দিচ্ছেন, তাদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ক্র্যাবের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আরিফ সংবর্ধনার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমরা কাউকে কোনো সংবর্ধনা দিইনি। আপনি এখানে ভুল করছেন। আমরা উনার (আনভীর) সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। এটা আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের অংশ।

তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করি। সায়েম সোবহান একজন ব্যবসায়ী। সেই হিসেবে উনার সঙ্গে আমরা দেখা করেছি।

গত ২৬ এপ্রিল সোমবার রাজধানীর গুলশানের দুই নম্বর অ্যাভিনিউয়ের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর প্লটের বি/৩ ফ্ল্যাট থেকে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার ঝুলন্ত অবস্থায় থাকা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে আসামি করে মামলা করেন মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান।

শেয়ার করুন!