‘সিলেটের বন্যা, সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী করলো বিএনপি’



প্রতীকী ছবি।
প্রেস রিলিজ-

বৃহত্তর সিলেটে ভয়াবহ বন্যার কারণ হিসেবে আওয়ামী সরকারের অপরকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী করছে সিলেট জেলা বিএনপি। পাশাপাশি বন্যার ভয়াবহতা অস্বীকার করে বন্যার্তদের সঙ্গে সরকারদলীয় নেতাদের উপহাস করার অভিযোগও করছেন জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ। এছাড়া চলমান দুর্যোগের সময় পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষে সরকারের আড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করাকেও বন্যাকবলিত সিলেটের সঙ্গে রসিকতার নামান্তর বলে উল্লেখ করছেন তারা।

বুধবার (২২ জুন) দুপুরে সিলেট নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সাংবাদিকদের সামনে এসব বক্তব্য তুলে ধরেন জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। তিনি বলেন, সিলেটের মানুষ যখন অসহায় হয়ে কান্না করছেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা যখন পানি ডিঙ্গিয়ে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন, ঠিক তখন দেশের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তি বন্যায় বিএনপির কর্মতৎপরতা নিয়ে ঠাট্টা করছেন। অথচ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে সিলেট জেলা বিএনপি ও অঙ্গ-সহযােগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে বন্যার শুরু থেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের বানবাসিদের দ্বারে দ্বারে আমরা যাচ্ছি, সাধ্যমতো ত্ৰাণ, নগদ অর্থ এবং তৈরি করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করছি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে আমাদের সাথে সার্বক্ষণিক যােগাযােগ রাখছেন। আমরা গতকাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলায় ৩৬ হাজার ২ শত পরিবারকে ত্রাণ ও শুকনাে খাবার, ১ লক্ষ ৯৩ হাজার জনকে তৈরি করা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি এবং ১১ হাজার ৩ শত পরিবারকে নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছি। এই পরিমাণ সময়ে সময়ে আরাে বাড়বে। তারপরও যখন প্রধানমন্ত্রী বিএনপির এসব কার্যক্রম দেখতে পান না তখন তা দেখার দায়িত্ব সিলেটবাসীসহ দেশবাসীর কাছে ছেড়ে দিলাম।

‘সিলেটের বন্যা প্রাকৃতিক নয়- মানবসৃষ্ট’ উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশােরগঞ্জ জেলায় বন্যার মূল কারণ রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের বাড়িতে যাতায়াতের জন্য হাওরের বুক চিরে ৪৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত ৭৭ কিলােমিটার রাস্তা। এরমধ্যে হাওরাঞ্চলে রয়েছে ৩০ কিলােমিটার বাঁধ। শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির সুবিধার জন্যই পানিতে হাবুডুবু খেতে হচ্ছে দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের এই বিশাল জনগােষ্ঠীকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে- কিশােরগঞ্জ-নেত্রকোনা থেকে শুরু করে সিলেট (সুরমা) বেসিন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ প্লাবনভূমি। এই ভূমি দিয়ে পূর্ব ভারতের নদী ও বৃষ্টির পানি নেমে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের বাড়িতে যাতায়াতের জন্য নির্মিত এই সড়কের কারণে ঢলের পানি হাওর থেকে নদীতে নামতে পারে না। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য- হাওরের বৈশিষ্ট্য হলাে, জলের অবাধ প্রবাহ। কিন্তু ভুল সড়ক, ভুল বাঁধ আর অবকাঠামাে নির্মাণের প্রতিক্রিয়ায় পানি নামতে পারছে না বলে সহনশীল বন্যা দুঃসহ হয়ে উঠেছে। আর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়েছে উজানে ভারতের তৈরি অজস্র বাঁধ-জলাধার, অজস্র ব্যারাজ, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ও অলকাঠামাে। এসবের কারণে নদী আর পলি বইতে পারছে না। পলি বইতে না পারলে পানিও বওয়া কঠিন হয় নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায়। ফলে নদী পানি উগরে দিচ্ছে, অস্বাভাবিক বন্যা হচ্ছে। অবস্থা হয়েছে এমন, ভারতের উজানে বন্যা ১০ দিন চললে বাংলাদেশে চলে মাসের বেশি দিন। এখন সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, বন্যার পানি নামাতে প্রয়ােজনে সড়ক কেটে দিন। কাটবেনই যদি তবে বানিয়েছিলেন কেন? বানালেনই যদি তবে ঘন ঘন কালভার্ট করেননি কেন?

সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপি বলে- ২০১৭ সালে হাওরের বাঁধ ভেঙে পড়ার জন্য পানি উন্নয়ন বাের্ড ইঁদুরকে দায়ী করেছিল। অথচ সরকারি গােয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, পাউবাের অনিয়ম আর ঠিকাদারদের দুর্নীতির কথা। স্থানীয় যুবলীগ নেতা এক আটকও করা হয়েছিল বিমানবন্দর থেকে। এখন সবাই নিশ্চুপ।

সিলেটের বন্যার প্রকৃত পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের কাছে পৌঁছানাে হচ্ছে না অভিযোগ করে জেলা বিএনপির সভাপতি বলেন, সিলেটে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যেটি সরকারিভাবে দেয়া হয়েছে বাস্তবতা তার চেয়ে ভিন্ন। বাস্তবে সিলেটের অবস্থা আরাে ভয়াবহ। গতকাল (মঙ্গলবার) প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগের এক নেতা সাংবাদিকদের উপর ক্ষোভ ঝেড়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করেছেন- ‘সাংবাদিকরা বন্যার যে ভয়াবহতা প্রচার করেছেন সিলেটে নাকি তার কিছুই হয় নি। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে তারা এখন সাংবাদিকদের উপরও ক্ষেপেছেন। কারন সাংবাদিকরা সিলেটের প্রকৃত অবস্থা গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। কারণ- তারা সংবাদপত্র ও বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের তথ্যমতে- এই অঞ্চলে চলতি বন্যায় এ পর্যন্ত পানিতে ডুবে এবং পাহাড় ধসে ২৩ জনের প্রাণহানী হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- আর কত প্রাণহানী হলে আওয়ামী লীগের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে?

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের নামে কোটি কোটি টাকা অপচয় করা হচ্ছে উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়- প্রধানমন্ত্রী সিলেটে এসে বলেছেন, সিলেট নিম্নাঞ্চল তাই আর কোনো উচুরাস্তা নির্মাণ করা হবে না। এখানে ফ্লাইওযার ও এলিভেটেট এক্সপ্রেস নির্মাণ করা হবে। এটি আসলে একটি মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা। কারণ- পদ্মাসেতুর অর্থায়ন থেকে দুর্নীতির কারণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করা থেকে সরে গিয়েছিল। আর আওয়ামী লীগ নিজেদের দুর্নীতি ঢাকতে গিয়ে পদ্মা সেতু করার জন্য দেশের অর্থনীতিকে তলানিতে নিয়ে এসেছে। বার বার ব্যায় বাড়িযে এখান থেকে আওয়ামী লীগ নেতারা শত শত কোটি টাকা লুটপাট করেছেন। এখন সিলেটকে বিক্রি করে তারা মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের পায়তারা করছেন। দেশের একটি বৃহত্তর অঞ্চল যখন পানির নিচে তলিয়ে আছে, প্রতিনিয়ত যখন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে, নৌকার অভাবে পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধা করা যাচ্ছে না, বানভাসি মানুষ খাবার পাচ্ছে না, বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে না, প্রযােজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছে না, তখন সরকার পদ্মা সেতু উদ্বোধনের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশি শিল্পীদের এনে অনুষ্ঠানের নামে পানিবন্দী মানুষদের সাথে উপহাস করছে।

সংবাদ সম্মেলনে জেলা বিএনপি বন্যা থেকে সিলেটের চিরস্থায়ী মুক্তি পাওয়ার জন্য স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, দুর্গতদের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য সহায়তা প্রদানপূর্বক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, বন্যার কারণ খুঁজে বের করে নদী ড্রেজিংসহ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি দাবি জানায়।

এছাড়াও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও তার দল আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে ‘চোখ থেকে রঙ্গিন চশমা এবং কানের তালা খুলে’ জনগণের দুঃখ-দুর্দশা ‘উপলব্ধি’র পরামর্শ দেয় জেলা বিএনপি।

সংবাদ সম্মেলনে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভােকেট এমরান আহমদ চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতা উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন!