আবু রুশ্দ সাহিত্য পুরস্কার পেলেন চার লেখক



সিএনবাংলাদেশ অনলাইন/

আবু রুশ্দ সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ অনুষ্ঠানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও মুহম্মদ নূরুল হুদার সঙ্গে পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিকেরা।

কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আবু রুশ্দ কিছুটা নিভৃতচারী ছিলেন। মৃত্যুর আগের প্রায় এক দশক এড়িয়ে গেছেন সভা-সেমিনার, এমনকি বন্ধুবান্ধবের আড্ডাও। এই নিভৃতচারী লেখকের নামে প্রবর্তিত সাহিত্য পুরস্কার-২০২১ পেলেন চার জন লেখক। তারা হলেন আনোয়ারা সৈয়দ হক, ওয়াসি আহমেদ এবং উদীয়মান শাখায় পাপড়ি রহমান ও মাহমুদ আখতার শরীফ। আবু রুশ্দ স্মৃতি পর্ষদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের হাতে তুলে দেয়া হয় পুরস্কারের স্মারক, শংসাপত্র ও সম্মানী।

সকালে ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনের রমেশ চন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলন কেন্দ্রে পুরস্কার প্রদানের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আহরার আহমেদ, শিক্ষাবিদ ফখরুল আলম, আবু রুশ্দ স্মৃতি পর্ষদের সদস্য সমাজকর্মী খুশি কবীর। আবু রুশ্দের পরিবারের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান তার শ্যালক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এ আর মামুন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কাজী মদিনা।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এম সাইদুজ্জামান বলেন, আবু রুশ্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল আমাদের। তার সান্নিধ্য আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

ভোরের কাগজ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আনোয়ারা সৈয়দ হক ‘চোখ’ উপন্যাসের জন্য এ পুরস্কার লাভ করেছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, পেশায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও আমি মূলত একজন লেখক। ছোটবেলা থেকেই আমি লেখালেখি করি। যদিও পরিবারের ইচ্ছায় আমাকে ডাক্তারি পড়তে হয়েছে, কিন্তু লেখালেখি থেকে আমি কখনও এতটুকু বিচ্যুত হইনি। লন্ডনে যখন হাসপাতালে কাজ করছি, তখন ‘সোনার হরিণ’ নামে একটি লেখা বাংলাদেশের কাগজে ছাপা হয়। সেই গল্পটি নিয়ে আবু রুশ্দ একটি ইংরেজি দৈনিকে আলোচনা লিখেছিলেন। ব্যাপারটি আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছিল। আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল যে, আমি লেখালেখি করতে পারব। আজ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে স্মরণ করছি। আমার ভেতরে যে আশার প্রদীপ তিনি জ্বালিয়েছিলেন, এ কারণে আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জীবনের একজন দি[নির্দেশক হিসেবে তিনি আমার ভেতরে বেঁচে থাকবেন।

‘বরফকল’ উপন্যাসের জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত ওয়াসি আহমেদ বলেন, উপশমের জন্য এবং আত্মতাড়না থেকে আমি লেখালেখি করি। সেই লেখা যদি পাঠকের মনোযোগ কাড়ে, সেটা আমার কাছে বাড়তি পাওয়া। পুরস্কারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও তাই। উপন্যাস শেষ করতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু ‘বরফকল’ শেষ করেছিলাম মাত্র সাত মাসে। কাজটি করোনাকালে পাঠক লুফে নিয়েছেন। পুরস্কারের জন্য এ বইটিকে বিবেচনা করায় আবু রুশ্দ স্মৃতি পর্ষদকে ধন্যবাদ।
পাপড়ি রহমান ‘নদীধারা আবাসিক এলাকা’ ও মাহমুদ আখতার শরীফ ‘মানুষ হবার কাল্পনিক গল্প’ উপন্যাসের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। পরের বছর থেকে এ পুরস্কারের আয়োজন করবে বাংলা একাডেমি।

পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, আবু রুশ্দ আমাদের শ্রেষ্ঠ অনুবাদকদের মধ্যে অন্যতম। কাজী নজরুলের অনুবাদ তিনি খুব ভালো করেছেন। এতো যত্নে অনুবাদ করতেন, সেখান থেকে কোনো কিছু বাদ দেয়া যেত না।

সভাপতির বক্তব্যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আবু রুশ্দ অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ও গম্ভীর। যারা তার সঙ্গে মিশেছেন, তারা জানেন, তিনি ছিলেন ভীষণ সংবেদনশীল ও স্নেহশীল মানুষ। আজ আমরা কেবল তাকে স্মরণ করছি না, তার নামে পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে তার সাহিত্যকে মর্যাদা দিচ্ছি। সাহিত্যকে মূল্য দেয়া এই সময়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমরা এমন এক পরিস্থিতির দিকে পতিত হচ্ছি, যেখানে বিচ্ছিন্নতা, বিদ্বেষ, আত্মকেন্দ্রিকতা, মুনাফালিপ্সা প্রবলভাবে আমাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

এই শিক্ষাবিদ আরো বলেন, আমরা প্রযুক্তির উন্নয়ন দেখেছি, যার প্রতিটি সাহিত্যকে সাহায্য করেছে। কিন্তু ইদানীং সাহিত্য অবমূল্যায়িত হচ্ছে। এ জন্য দায়ী মালিকানা। পুঁজির দৌরাত্মে বাণিজ্য প্রধান হয়ে উঠেছে। মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে, যা করোনায় চরম রূপ লাভ করেছে। এই সময়ে সাহিত্য অত্যন্ত মূল্যবান। সাহিত্য মানুষকে সংলগ্ন করে, কাছে নিয়ে আসে, অনুভূতিকে পরিশীলিত করে, ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে। আজ এই পুরস্কার সাহিত্যের প্রতি আমাদের আনুগত্য ও ভালোবাসার প্রকাশ।
আবু রুশ্দ গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে শিক্ষকতা ও লেখালেখিতে যুক্ত ছিলেন। তার প্রথম গল্পের সংকলন ‘রাজধানীতে ঝড়’। গল্প, উপন্যাস মিলিয়ে তার রচনার সংখ্যা কম নয়।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে কিংবা তার আগে লেখালেখি থেমে গিয়েছিল বলে হয়তো এ প্রজন্মের পাঠকেরা আবু রুশদকে তেমনভাবে চেনেন না। তার লেখা গল্প-উপন্যাস অথবা আত্মজৈবনিক রচনাগুলোও তেমন সুলভ নয়। ফলে তার নাম ও রচনা প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে বলেই মনে হয়। নতুন প্রজন্মের পাঠকদের সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিতে এই সাহিত্যিকের রচনা পুনর্মুদ্রণের আহ্বান জানান অতিথিরা।

শেয়ার করুন!